গল্প | উড়ান মেঘের দেশে - পর্ব-১১ | Oran megher deshe - Part-11

লেখিকা-ওয়াসিকা নুযহাত 



অন্ধকার অন্তরীক্ষ আলোর ফোয়ারায় উদ্ভাসিত হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। বাতাসে ভেসে আসছে শহরতলির উত্তাল জনতার হর্ষধ্বনি। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে ধ্বনিত হচ্ছে আতশবাজির শব্দ।
তিন ভাইবোন ছাদের কার্নিশের ধারে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল। অজয় তার অসুস্থতার কথা ভাই-রাজাকে বলেনি। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু না বললেও তুর্যয় টের পাচ্ছে ছোট ভাইয়ের মধ্যে একটা বড় ধরণের পরিবর্তন এসেছে। তার কথাবার্তা আগের চাইতে উদ্ধত। এতদিন পর বড় ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছে কিন্তু তার মধ্যে কোনও উচ্ছ্বাস নেই। সীমাহীন বিষণ্ণতার উৎকট প্রাবল্যে যেন সর্বদা গমগম করছে তার কণ্ঠস্বর। এদিকে তুর্যয়ের মানসিক অবস্থা এই মুহূর্তে কিছুটা বিঘ্নিত। নীহারিকাকে জনসম্মুখে উপস্থাপন করার অপরাধে ক্ষণকাল পূর্বে মায়ের সাথে তার হালকা পাতলা তর্ক যুদ্ধ বেঁধে গেছে। নীহারিকার বন্দি জীবনের আদিগন্ত বৃত্তান্ত শুনে রীতিমতন থ বনে গেছে সে। এরা কোন যুগে বসবাস করে? একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক একটি মেয়েকে সম্পূর্ণ কারারুদ্ধ করে রাখতে চাইছে। কী অবিশ্বাস্য! ছোট বোনের দুর্গতির কথা চিন্তা করে তার মন হয়ে উঠেছে বিষাদপূর্ণ। একমাত্র আদরের ভগ্নীর এই বন্দীদশা জ্ঞানত এবং জাগ্রত অবস্থায় সে কোনদিনই মেনে নেবে না। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, দেশে ফেরার প্রথম দিনটাতেই বাবা মায়ের সাথে তার একাধিক বিষয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। এই মতের অনৈক্যে কোনও সুফল বয়ে আনবে বলে মনে হচ্ছে না। তবে সে দমে যাবার পাত্র নয়। রাজপরিবারের শত বছরের ঘুণে ধরা, অযৌক্তিক, প্রাচীনপন্থী রীতিনীতি এবারে বদলাবার সময় এসেছে। তাকে যদি কখনও সিংহাসনে বসতেই হয়, তবে সে হবে সেই সিংহাসনের স্বাধীন স্বত্বাধিকারী। কারো কলের পুতুল হবে না। সমুদ্রকুঞ্জ নিশ্চয়ই একদিন তার স্বপ্নের সমুদ্রকুঞ্জে রূপান্তরিত হবে। 


টেরেসে কৃত্রিম কোনও আলো নেই। দূরের আকাশের আতশবাজির আবছা দ্যুতি এসে পড়ছে। রানিমা খানিক দূরে আসন গ্রহণ করেছেন। সম্মুখে সেগুন কাঠের তেপায়া টেবিল। তার ওপর একটি মোমদানি। রানির পাশে বসেছেন জাপান থেকে আগত ইন্টেরিয়র ডেকোরেটর। যুবরাজ হিসেবে তুর্যয়ের রাজ্যাভিষেক’ কে কেন্দ্র করে বেশ কিছু উৎসব পালন করা হবে। উৎসবের কেন্দ্রস্থল সাজানোর দায়িত্ব পড়েছে জাপানি ভদ্রলোকের ওপর। এই মুহূর্তে তার হাতে শোভা পাচ্ছে রুপোর হাতল ওয়ালা চিনা মাটির চায়ের পেয়ালা। উর্মিলার ইংরেজি জ্ঞান অতি ক্ষীণ। তাই এই সভা পরিচালিত হচ্ছে একজন দোভাষীর মাধ্যমে। মেহেরু কিছুক্ষণ হল টেরেসে উপস্থিত হয়েছে। উর্মিলা ব্যস্ত আছেন বিধায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে এক কোণে। কার্নিশের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা তুর্যয়ের ওপর চোখ পড়েছিল তার। অন্ধকারে কিছুই ঠিক মতো বোঝা যায় না। তবে মনে হচ্ছে আগের চাইতে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়েছে। আতশবাজির আলোয় হঠাৎ ওর মুখটা ক্ষণিকের জন্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মেহেরু ওই মুখের একটা পাশ দেখতে পায়। পাঁচ বছর আগে, তাকে কিছু না জানিয়েই, সম্পূর্ণ বিনা নোটিশে ছেলেটা দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল। মেহেরু জ্বরে পড়ে টানা চারদিন রাজবাড়িতে অনুপস্থিত ছিল। জ্বরটা অবশ্য বাহানা ছিল। জ্বরজারি নিয়েও ছাত্র ছাত্রি পড়ানোর রেকর্ড আছে তার। এবারের অনুপস্থিতির মূল কারণ তুর্যয়কে এড়িয়ে যাওয়া। তবে মেহেরু স্বপ্নেও ভাবেনি যে মাত্র কয়েকদিনের উপেক্ষার শাস্তি এতো কঠিন হতে পারে। পঞ্চম দিন যথাসময়ে পাঠশালায় উপস্থিত হয়ে নীহারিকা আর অজয়কে স্কুলের হোমওয়ার্ক করালো। রোজ বিকেলে তুর্যয় একবার পাঠশালার জানালায় উঁকি দেয়। সে পড়ে না এখন আর মেহেরুর কাছে। কলেজের চূড়ান্ত বার্ষিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার পর থেকে তার একটু অন্যরকম ভাবসাব হয়েছে। আচরণ দেখে মনে হয় বিশ বছরের তরুণ নয়, বত্রিশ বছরের যুবাপুরুষ। স্বভাবে কোনও বয়সোচিত আড়ষ্টটা নেই। রাজা মশাইয়ের পুত্রকন্যাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ জনই সবচাইতে মেধাবী। এই বয়সেই তার ব্যক্তিত্ব উজ্জ্বল। যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক অনুষ্ঠান, সভা বা প্রেস কনফারেন্সে সে দ্বিধাহীন কণ্ঠে বক্তৃতা দেয়। রাজ্যের নাগরিক এবং রাজনৈতিক প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ে এই প্রখর তরুণটির আছে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি। এক কথায় সে কিছুই মেনে নিতে চায় না। প্রতিটি ঘটনা বা মতবাদ নিজস্ব যুক্তির আলোকে দেখতে চায়। নিজের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে শুধুমাত্র নিয়ম রক্ষার খাতিরে কোনও কাজ সে করে না। বরং নিয়ম ভাঙ্গাটাই যেন তার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দদায়ক কাজ। মেজো কুমারের মতো খেলাধূলা, অশ্বারোহণ এবং শিকারে পারদর্শী নয়, তবে খুব ভালো ছবি আঁকতে পারে। তার মনে শিল্পের সুষমা আছে। অতি বাল্যকাল থেকে সে একজন পাকাপোক্ত সাহিত্য বোদ্ধা। দিনরাত বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে থাকা, অবসরে ছবি আঁকা, আর সুযোগ পেলেই জ্ঞানী জ্ঞানী কথা বলা তার স্বভাব।


খবরটা প্রথমে নীহারিকা দিয়েছিল, ‘জানো আপা, বড় ভাই-রাজা তো চলে যাচ্ছে।’ 


- ‘কোথায় যাচ্ছে?’  


-’বিদেশে।’ 


-’কেন? হঠাৎ?’ 


-’হুম হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ 


অজয় বলল, ‘এই দেশের পড়াশোনার মান ভালো না, তাই।’ 


-’কেন? এই দেশে কি উচ্চশিক্ষিত লোকের অভাব আছে? শিক্ষা লাভের জন্য নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যেতে হবে, এটা কেমন কথা?’ 


সেদিন আর ছাত্র পড়ানোতে মন বসল না। কয়েক মাস হলো তুর্যয়ের জন্য একটা আলাদা মহল বরাদ্দ করা হয়েছে। মূল রাজভবন থেকে প্রায় মাইল খানেকের পথ। ওদিকটায় কখনও যায়নি মেহেরু। বিশেষ করে পাঁচ ছয়দিন আগে যে ঘটনাটা ঘটে গেছে এরপর আর তুর্যয়ের ব্যক্তিগত বাস ভবনে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। পাঠশালাতেই অপেক্ষা করল সন্ধ্যা পর্যন্ত। তুর্যয় এলো না। সামর্থ্যের অভাবে মেহেরুর তখন নিজস্ব কোনও সেলফোন নেই। নেই ভৃত্য মারফত খবর পাঠানোর স্পর্ধা। সে সামান্য একজন স্বল্প বেতনভুক কর্মচারি। রাজকুমারের দ্বার অবধি পৌঁছনো তার জন্য অতি দুঃসাহসিক কাজ।এমনিতেও রাজবাড়ির বাতাসে তার নামে শুধুই দুর্নাম ভেসে বেড়ায়। একদিন শঙ্খবালা ফট করে বলে বসেছিল, হ্যাঁগো, আমাদের রাজকুমারের সাথে তোমার এতো ঢলাঢলি কীসের?’ 

কী বিশ্রী লাগলো শুনতে কথাটা! মেহেরু ঝাঁঝালো গলায় বলল, ‘বাজে বকছ কেন? ঢলাঢলি আবার কী জিনিস? ও আমার ছাত্র। বয়সেও কত্ত ছোট। এসব কথা মুখে আসে কী করে?’ ’ 


শঙ্খবালা ঠোঁট বাঁকিয়ে কটাক্ষ করে বলেছিল, ‘সারা রাজবাড়িতে ঢিঢি পড়ে গেছে, তাতে কিছু হয় না। আমি বললেই দোষ!’ 


সেদিন শঙ্খবালার কথায় রেগে গিয়েছিল বটে, কিন্তু অবিলম্বেই তার চিত্তশুদ্ধি হল। কী হবে যদি রানিমার কানে কেউ এসব ভুলভ্রান্তিময় তথ্য তুলে দেয়? মানুষের মন ভীষণ নোংরা! এ কথা সত্য তুর্যয়ের সাথে সময় কাটাতে তার ভালো লাগে। মাঝে মাঝে মনে হয় ওর চেয়ে ভালো বন্ধু বুঝি আর একটিও নেই। একমাত্র ওর কাছেই মনটাকে সম্পূর্ণ ভাবে উন্মুক্ত করে দেয়া যায়। কলেজের বার্ষিক পরীক্ষার পর … তুর্যয়ের তখন অফুরন্ত অবসর। পাঠশালার নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হবার পরে, বিকেলবেলায় মেহেরুরও আর কোনও কাজ থাকত না। একেকদিন নীহারিকা আর অজয়ের প্রস্থানের পরেও তুর্যয় বসে থাকত। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি নানা বিষয় নিয়ে কথা বলতে ভালবাসত সে। সাবেক ছাত্রের সমৃদ্ধ জ্ঞানের ভাণ্ডার পুলকিত করত মেহেরুকে। গল্পে, কথায়, হাসি তামাশায় কোনদিক দিয়ে যে সময় কেটে যায় তার ইয়ত্তা নেই। তুর্যয়ের মধ্যে রাজকুমার সুলভ কোন দাম্ভিকতা নেই। তার মতো উচ্ছ্বল, প্রখর বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন তরুণের সাথে সময় কাটাতে যে কারো ভালো লাগবে। এদিকে মেহেরু এমন একজন ব্যক্তি, যে প্রথমবারের মতো তুর্যয়ের মনের আকাশে জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত করেছিল। সেই জ্ঞানচর্চা শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মেহেরুর মাধ্যমেই তুর্যয়ের পরিচয় ঘটে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, চার্লস ডিকেন্স এবং শেক্সপীয়ারের মতো কিংবদন্তীদের সাথে। তাই সম্মান, ভালো লাগা, মুগ্ধতায় মিলেমিশে এই রমণীর স্থানটি যে মনমন্দিরের সবচাইতে উচ্চতর সিংহাসন ছাড়া অন্য কোথাও নয়, সেই সত্য উপলব্ধি টুকু বুদ্ধিদীপ্ত, সপ্রতিভ রাজকুমার টের পেয়েছিল অতি অল্প বয়সেই। 


মাঝেমাঝে ওরা পদ্মপুকুরের ঘাটে গিয়ে বসত। সেদিন ছিল চৈত্রের বিকেল। মেঘের ঘনঘটা রোদের তেজ তাড়িয়ে দিয়েছে। বাতাসে শান্তির ছোঁয়া। ঘুঘু ডাকছে। মেহেরু পুকুরের জলে পা ডুবিয়ে বসে ছিল। তুর্যয় বসেছে এক ধাপ ওপরের সিঁড়িতে। ঘাটের পাশেই একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। বাতাসে কৃষ্ণচূড়ার লাল পাপড়ি ঝরে পড়ছে, ধবধবে সাদা পাথরের ঘাটে, পুষ্করিণীর আয়নার মতো স্বচ্ছ জলে। মেহেরু একটা গাঢ় নীল রঙের শাড়ি পরেছে। চুলের হৃষ্টপুষ্ট বেণী ঝুলে আছে ছিপছিপে মেদহীন পিঠের ওপর। ওর শরীরের গড়ন খানি সাধারণ নারীদের চাইতে লম্বা। গায়ের ত্বক এতো মসৃণ, ঝকঝকে, পেলব যে ওই চামড়া সম্পূর্ণ ঈশ্বরপ্রদত্ত বা অকৃত্রিম বলে মেনে নিতে কষ্ট হয়। তার চোখের আকার টানা টানা, হরিণীর ন্যায়। দেহের প্রতিটি গতিতে সৌন্দর্যের এক মাদকতাময় ঝঙ্কার, ক্ষুরের মতো ধার! সেই যৌবন উদ্ভাসিত রুপ দেখে যেকোনো পুরুষকে থমকে যেতে হয়। শুধু পুরুষ কেন, সমস্ত পৃথিবীই তাকে দেখে থমকায় ...চমকায় ...রুপের মোহে পড়ে ভালোবাসে …… আবার রুপের মোহেই ঘৃণা করে।   


মেহেরুর চোখ পড়ল হঠাৎ কয়েক হাত দূরে উপস্থিত তরুণটির দিকে। 


-’কী হল?’ 


তুর্যয় হাঁটুতে কুনুইয়ের ভর দিয়ে পাঁচ আঙ্গুলের ওপর চিবুক রেখেছে। তার ধূসর রঙের ভাসাভাসা দুটি চোখ মেহেরুর আরক্তিম মুখপানে নিবদ্ধ। ঠোঁটে হালকা হাসি। মেহেরুরু প্রশ্নের উত্তর দিল সে কবিতায়। 


 এসো সখি, এসো মোর কাছে,

                কথা এক শুধাবার আছে!

          চেয়ে তব মুখপানে ব'সে এই ঠাঁই--

          প্রতিদিন যত গান তোমারে শুনাই,

          বুঝিতে কি পার সখি কেন যে তা গাই?

         

               বুঝ না কি হৃদয়ের

                          কোন্‌খানে শেল ফুটে

                তবে প্রতি কথাগুলি

                          আর্তনাদ করি উঠে!


মেহেরু থম ধরা চোখে তাকিয়ে রয় কিছুক্ষণ। তার বুকের মধ্যে একটা অসংলগ্ন কম্পন সৃষ্টি হয়। কেমন যেন ভয় করে …… সেদিনের ভয়ের চাইতেও অধিক তীব্রতর ভয় এই মুহূর্তে তাকে জেঁকে ধরেছে। জাপানি ভদ্রলোকের প্রস্থানের পর তুর্যয় অগ্রসর হয়ে আসন গ্রহণ করেছে। সে মেহেরুর মুখের দিকে একটিবারের জন্যও তাকায়নি। ওই মুখের দিকে তাকালে সর্বনাশ ছাড়া আর কিছুই প্রতিপাদ্য হয় না। তবুও এই নারীর অস্তিত্বে ভয়ঙ্কর এক নেশা আছে। সেই নেশা এখন ...এতদিন বাদে আবারও তার বুকের ভেতরটা মধ্যাহ্নের ঝাঁঝাঁ করা বিষণ্ণ আকাশের মতো বিবশ করে তুলেছে। 


মেহেরু কোণঠাসা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। যে তুর্যয়কে সে এককালে চিনত, জানত, সেই তুর্যয় হারিয়ে গেছে বহু আগে। এখন যে যুবকটি তার সামনে উপস্থিত আছে সে তার ছাত্র নয়, বন্ধু নয়, সে শুধুমাত্র সমুদ্রকুঞ্জের যুবরাজ। পিতার অনুপস্থিতিতে সেইই হবে এই দেশের একমাত্র রাজাধিরাজ, সম্রাট। আর মেহেরু তার বেতনভুক সাধারণ এক কর্মচারী। 


উর্মিলা হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডাকলেন। এগিয়ে এলো মেহেরু। মোমবাতির আলোয় তুর্যয়ের মুখটা একবার দেখল সে ভালো মতো। চক্ষুদ্বয় নিবদ্ধ হাতে ধরা একটি কাগজের ওপর। কপালে ঈষৎ কুঞ্চন। তার মুখে কৈশোরের সরলতা নেই আর, বরং তার বদলে আছে লাবন্যমাখা যৌবনের কঠিন, কোমল, নিটোল পরিপূর্ণতা! 


রানিমা বললেন, ‘তুর্যয় তোমাকে ওর অফিসে নিয়োগ দিতে চাইছে। তুমি কি রাজি?’ 


মেহেরু ভীষণ বিব্রত বোধ করছে। তার মনে হচ্ছে উর্মিলার মতো দুর্বোধ্য মহিলা সে এর আগে কখনও দেখেনি। এই মহিলা আসলে চাইছে কী? নিজ মুখে ছেলের উত্থাপিত প্রস্তাব নাকচ করে দিলেই তো হয়। প্রত্যাখানটা কেন মেহেরুর কাছ থেকেই আসতে হবে? মেহেরু চোখ নিচের দিকে নামিয়ে অত্যন্ত নমনীয় গলায় বলল, ‘আমি তো বর্তমানে আপনার সাথে কাজ করছি রানিমা। ‘ 


তুর্যয়ের চোখে একটি তেজের শিখা ধক করে প্রজ্বলিত হয়ে উঠল। হাতে ধরা কাগজটা টেবিলের ওপর রেখে সে মেহেরুর দিকে না তাকিয়েই কঠিন গলায় বলল, ‘কাল থেকে আপনি মায়ের অফিসে নয়, আমার অফিসে কাজ করবেন। আজ রাতের মধ্যেই নিয়োগপত্র ইমেইল করে দেয়া হবে।’ 


কথার ধরণটা মেহেরুর পছন্দ হলো না। চট করে মস্তিষ্কে চলকে উঠল বিষয়টা, এই ছেলে পাঁচ বছর আগে তাকে কিছু না বলেই চলে গিয়েছিল। এরপর আর কোন যোগাযোগ নেই! এতদিন পর ফিরে এসে এমনভাবে ফরমায়েশ দিচ্ছে যেন সে তার বাড়ির বাঁধা চাকর। ভাবনাটা মাথায় চড়ে বসার আগেই ধূলোর মতো ঝেড়ে ফেলতে হল। কারণ আদতে … মেহেরু রাজবাড়ির চাকরগোত্রীয় একজনই বটে। এই চাকরি ছেড়ে দিলে তাকে মা বোন নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে। ছোট বোনের পড়ার খরচ জুটবে না। তার মতো অর্ধ শিক্ষিত হয়ে জীবন কাটাতে হবে। বোনটার গ্র্যাজুয়েশন শেষ হতে আরো বছর খানেক সময় বাকি আছে। অন্তত এই সময়টুকু মুখ বুজে সব সহ্য করতে হবে। সে বিচলিত ভাবটা দমন করে অনেক কষ্টে স্বাভাবিক গলায় বলল, ‘মাননীয় রাজপুত্র, রানিমার দপ্তরে নতুন কারো নিয়োগ না হলে আমি কীভাবে অন্যত্র স্থানান্তরিত হই?’ 


মেহেরু জানে, যে করেই হোক উর্মিলাকে তার খুশি করতে হবে। উর্মিলার দয়ায় সে বেঁচে আছে। নিমকহারামি করে বসলে চলবে না। উর্মিলার ক্ষমতা আকাশস্পর্শী। তাঁর জীবন ইতিহাসে ক্রোধের বশে গরিব দুঃখীদের ঘর পুড়িয়ে ছারখার করে দেবার মতো ঘটনারও নজির আছে। কিন্তু তুর্যয় তো কোনও স্থিরচিত্তের মানুষ নয়। অল্পতে রেগে যাওয়ার বদ অভ্যাস আছে এই ছেলের। সে উগ্র কণ্ঠে মেহেরুকে বলল, ‘রানিমার অফিস নিয়ে আপনাকে চিন্তা করতে হবে না। আপনাকে যা বলা হয়েছে তাই করুন।’ 


একথা কোনভাবেই অস্বীকার করা যায় না যে রানিমার দপ্তরের চাইতে রাজ্যের সম্ভাব্য যুবরাজের দপ্তর অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করে। মেহেরুর নিশ্চয়ই এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মুখে মুখে কথা বলা মানায় না। এই বাস্তবসম্মত বিষয়টি উপলব্ধি করে মেহেরু চুপ করে রইল, নতমস্তকে। উর্মিলা বললেন, ‘ইয়ে ...তুর্যয়, বলছিলাম কি, মেয়েটা যেহেতু চাইছে না …’ 


-’আমার সিদ্ধান্ত আমি জানিয়ে দিয়েছি! এই সিদ্ধান্তের হেরফের হবে না!’ 


মায়ের কথার মাঝখানে বাধ সাধে তুর্যয়। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। প্রস্থান করার আগে মেহেরুর উদ্দেশ্যে বরফ শীতল কণ্ঠে আদেশ দেয়, ‘কাল সকাল দশটায় আমার সাথে দেখা করবেন। শার্প অ্যাট টেন।’ 


উর্মিলা কড়া চোখে একবার তাকায় মেহেরুর দিকে। মেহেরু বিপন্ন বোধ করে। ভয়ে আত্মা শুকিয়ে আসে তার। তুর্যয় প্রস্থান করার পর উর্মিলাও উঠলেন বসা থেকে। মেহেরুর উদ্দেশ্যে ক্ষীণ গলায় বললেন, ‘এদিকে এসো। কথা আছে।’  


------------------------------------------ 


রাশিকার মুখে একটা কাপড় বেঁধে দেয়া হয়েছে। জোরজবরদস্তি করে ঘোড়ায় তোলার পর থেকেই সে প্রাণপণে চেঁচিয়ে যাচ্ছিল। চিৎকার থামানোর জন্য বাধ্য হয়ে মুখ বাঁধতে হয়েছে। ঘোড় সওয়ারি ঝড়ের বেগে ছুটে এসেছে মাইল খানেক দূরের একটি প্রাসাদে। টেনে হিঁচড়ে রাশিকাকে নিয়ে এসেছে পাতালপুরির বদ্ধ কক্ষে। কাঠের চেয়ারে বসিয়ে দুই হাত পেছনে মুড়িয়ে বেঁধে ফেলেছে। মুখের কাপড়টিও আর খোলা হয়নি। মুখ এবং হাত বাঁধা অবস্থায়ই অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে তাকে একলা ফেলে রেখে মানুষ দুজন বেরিয়ে গেছে। এক দুঃসহ আতঙ্কে রাশিকার দম প্রায় আটকে আসছে। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে চাইছে সে, কিন্তু পারছে না। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে হাতের কব্জির দড়ির গিঁট খুলতে চাইছে, পা-জোড়া দাপাদাপি করে ক্ষোভ প্রকাশ করছে। কিন্তু কিছুতেই লাভ হচ্ছে না। তার এই ক্ষোভের প্রকাশ কোন জন মানুষের কান পর্যন্ত পৌঁছনোর সুযোগ নেই। পাতালঘরে কদাচিৎ ভৃত্যরা আসে। অজয়ের বাঁধা গুণ্ডারাই এই পাতাল ঘরের একচ্ছত্র মালিক। তবে তারাও সারাক্ষণ উপস্থিত থাকে না। যখন বন্দিকে উত্যক্ত করার সময় বা ইচ্ছে হয় তখনই তাদের উপস্থিতি ঘটে। বন্দি যদি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কেউ হয় তবেই একমাত্র মেজো কুমার সশরীরে নেমে আসে পাতালপুরীতে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের কথা ভুলে যায়। গুণ্ডা বাহিনী ইচ্ছে মতো শায়েস্তা করে, কারো কারো কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় করে। তবে এসব ক্ষেত্রে নিয়ম হচ্ছে শুধুমাত্র দুষ্কৃতিকারীদেরকেই এই বন্দিশালায় আটক করা হবে। কোন নিরপরাধ ব্যক্তিকে অযথা শাস্তি দেয়ার নিয়ম নেই। রাশিকাই প্রথম এবং একমাত্র নিরপরাধ ব্যক্তি, যাকে কোনও যুতসই কারণ ব্যতীত পাকড়াও করা হয়েছে এবং খুব স্বাভাবিক ভাবেই সেই বন্দিনীর কথা রাজকুমার অজয় বেমালুম ভুলে বসে আছে।

No comments

Powered by Blogger.