গল্প | উড়ান মেঘের দেশে - পর্ব-১০ | Oran megher deshe - Part-10
লেখিকা-ওয়াসিকা নুযহাত

- ‘তুমি কে?'
ধোঁয়াশা মেঘের আড়াল থেকে হিম শীতল এক আসুরিক কণ্ঠ ভেসে আসে। রাশিকা কম্পমান বক্ষ নিয়ে অশ্বারোহীর দিকে তাকায়। ঘাড় পর্যন্ত নেমে আসা এলোমেলো চুল বিকেল বাতাসে উড়ছে।
তীক্ষ্ণ নাসিকার হাড়টি কিঞ্চিৎ বাঁকা, ঢেউ খেলানো। পিতল ধাতুর মতো গায়ের রং। লম্বা … এতো লম্বা মানুষ রাশিকা মনে হয় এর আগে কখনও দেখেনি। চোখের রং লালচে। মুখে রুক্ষতা! যেন এই মাত্র মানুষ খুন করে এসেছে।অশ্বারোহী রাশিকার চারপাশে প্রদক্ষিণ করতে করতে আরও একবার হুঙ্কার ছাড়ে, ‘নাম কী?’
রাশিকা ভয় পেলে তোতলায়। বিব্রত ভাবে বলল, ‘র র র … রাশিকা।’
যুবকটি ঘোড়া থামায় ওর মুখোমুখি। কটাক্ষ করে বলে, ‘কী? রশিদ কাকা?’
শব্দদুটো উচ্চারণ করতেই যুবকের সঙ্গী দুজন উচ্চস্বরে হেসে উঠল। কৌতুকের পাত্রী বনে যাবার পর রাশিকার ভয়ের মাত্রা বুঝি প্রশমিত হলো কিছুটা। আগের চাইতে শক্ত গলায় টেনে টেনে বলল, ‘রা - শি - কা।’
অজয়ের রুক্ষ মুখে একটা ডাকাতিয়া হাসি বিদ্যুতের মতো চিলিক দিয়ে উঠল, ‘নাহ ...তোমার নাম রশিদ কাকা আজ থেকে। ঠিক আছে?’
রাশিকার ভেতরকার ভয়ার্ত, তটস্থ, বিব্রত মনটা যেন ভস করে হাওয়া হয়ে গেলো, তার বদলে জাজ্বল্যমান হয়ে ফুটে উঠল দুর্দমনীয় ক্রোধ। সিল্কের মতো রেশমি বব চুল উড়ছিল তিরতির করে। আদুরে ছোট্ট নাকটায় ক্ষোভ স্বর্বস্ব কুঞ্চন। অজয়ের রক্তাভ চোখজোড়া থমকে গিয়েছিল পানপাতার মতো কুসুমপেলব মুখটার চিবুকের খাঁজে। ওখানে রোদ খেলছিল। স্বচ্ছ কাচের মতো এক টুকরো ঝকঝকে রোদ!
-’তুমি কে আমার নাম পাল্টে দেয়ার? হু দ্যা হেল আর ইউ?’
-’তুমি কে? তোমার পরিচয়টা আগে জেনে নেই।’
রাশিকা বাচ্চাদের মতো জিব বের করে বলে, ‘আমি তোমার ইয়ে … ফাজিল ছেলে!’
অজয়ের মুখটা হা হয়ে গেলো বিস্ময়ে। এই একরত্তি মেয়ে কিনা রাজ্যের মেজো কুমারকে বলে ‘আমি তোমার ইয়ে!’ এত বড় দু:সাহস! কোন দেশের চিড়িয়ারে ভাই এটা? সঙ্গীদের একজন অজয়ের দিকে চেয়ে বলল, ‘একে কি পাকড়াও করব?’ অজয় হাত তুলে থামিয়ে দিল ‘দাড়াও ...।’
উদ্বেগ উত্তেজনায় রাশিকার হাত থেকে সেলফোনটা পড়ে গিয়েছিল। সে এখন নিচু হয়ে সেলফোন হাতে তুলে নিয়েছে। ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে আপন মনে বকবক করছে।
-’ইয়ে মানে?' অজয় প্রশ্ন করে গা শিরশিরে ঠান্ডা গলায়।
-’ইয়ে মানে বোঝ না?’
-’বুঝি না।’
-’তা বুঝবে কী করে, মাথার ভেতর তো গোবর। গোবর না হলে কি রাশিকাকে রশিদ কাকা ডাকতে?'
এদিকে অজয়ের উপবাসের আজ দুদিন হতে চলল। গতকাল ভোর থেকে এই মুহূর্ত পর্যন্ত তার পেটে পানি ছাড়া কিছুই পড়েনি। নিশ্বাসে সারাক্ষণ একটা আঁশটে ঘ্রাণ। চোখে জ্বালা। হাতে পায়ে নিশপিশ। তার চেহারা খানাও বদলে গেছে রাতারাতি। আয়নার সামনে দাঁড়ালে মনে হয় যেন মানুষ নয়, আস্ত এক জানোয়ার। লোক চক্ষুর আড়ালে থাকার উদ্দেশ্যে ভাই- রাজাকে বরণ করার জন্য বিমানবন্দরে যায়নি সে। সারাদিন নিজ মহলেই ছিল। দুপুরের পর তৈরি হয়ে দুজন সহচর নিয়ে জঙ্গলে গিয়েছিল শিকারের উদ্দেশ্যে। প্রায় দেড় ঘণ্টা ওঁত পেতে বসে থাকার পর একটি চিত্রা হরিণকে গুলিবিদ্ধ করতে পারল। সঙ্গী দুজন অন্যদিকে শিকারের খোঁজে ব্যস্ত ছিল। হরিণটিকে গুলি করার পর অজয় ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে এলো ধীরেধীরে। শাল গাছের গুঁড়ির আড়ালে আহত হরিণটা কাতরাচ্ছিল। গুলি লেগেছে পেটে। ফিনকী দিয়ে রক্ত ছুটছে গুলিবিদ্ধ জায়গা থেকে। শিকারের কাছে যেতেই তাজা রক্তের গন্ধ অজয়ের নাকে এসে ধাক্কা খেলো। বুক ভরে শ্বাস টেনে নিল সে। মনে হলো যেন রক্তের ঘ্রাণ নয়, বরং ফুসফুস ভরে গেলো অক্সিজেনে। এবং ঠিক সেই সময়, নিজেকেই নিজে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে হরিণের গায়ের গুলিবিদ্ধ জায়গাটা থেকে আঙ্গুল দিয়ে এক চিমটি রক্ত তুলে নিয়ে জিবে ছুঁইয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরে কুলকুল করে বয়ে গেলো প্রাণের স্ফুরণ। মনে হলো এই অরুণ বরণ প্রাণময় তরলটির জন্যই সে তৃষিত ছিল বিগত অনেক গুলো প্রহর। তার ওপর যেন অসুর ভর করেছে। একটুও সময় নষ্ট না করে আহত হরিণটার ঘাড় মটকে পান করে ফেলল অনেক খানি তাজা রক্ত। সে জানে না কী করছে, কেন করছে। ভেতরকার মনুষ্যত্বর সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে যেন কোন এক কালোজাদুর বশবর্তী হয়ে আজকে সে মানুষ থেকে পিশাচে পরিণত হয়ে গেছে। অপ্রত্যাশিত মর্মান্তিক ঘটনাটা ঘটে যাবার পর কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শালবনের বৃক্ষরাজির মধ্যে নিজেকে আড়াল করে বসে রইল অনেক ক্ষণ। কী হচ্ছে এসব? সমুদ্রকুঞ্জের নামকরা ডাক্তার তার রোগ নির্ণয় করতে অপারগ। ডাক্তারকে পুরো বিষয় খুলে বলতেও অস্বস্তি হয়েছে। তার মনে হচ্ছে পৃথিবীর কেউ তাকে বুঝবে না। হরিণের রক্ত পান করার পর আত্ম বিশ্বাসের খুঁটি নড়বড়ে হয়ে গেছে। এই পরিবর্তনের পেছনে কী ব্যাখ্যা থাকতে পারে? ব্যাপারটা মানসিক বিকারগ্রস্থতার লক্ষণ নয় তো? তার কি একজন মনোবিজ্ঞানীর সাথে কথা বলা প্রয়োজন? সে ছিল ফূর্তিময় এবং উচ্ছন্ন জীবন যাপনে অভ্যস্ত এক তরুণ। খেলাধুলার প্রতি প্রবল ঝোঁক। শহরের প্রতিটি ক্রীড়া ক্লাবে তার কোটি টাকার অনুদান আছে। তার উদ্যোগে কিশোর কিশোরীদের জন্য ক্রিকেট স্কুল গঠন করা হয়েছে। যে স্কুলে বিনা পয়সায় অনুর্ধ আঠারো বালক বালিকারা ক্রিকেট শিখতে পারবে। নিজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী না হলেও দেশের অজস্র দরিদ্র শিক্ষার্থীকে সে অর্থায়নের মাধ্যমে শিক্ষালাভের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বদ অভ্যাসের মধ্যে আছে মদ এবং নারী আসক্তি। একমাত্র মা এবং বোন ছাড়া জগতের অন্য কোনও মেয়েকেই সে মন দিয়ে ভালোবাসার যোগ্য মনে করেনি কখনও। যেহেতু তার উপাধি ‘রাজকুমার’ … তাই মনের অলিগলি ঝাপসা থাকলেও, দেশের নানা স্তরের, নানা বয়সী নারীরা তাকে সঙ্গ দিয়ে যেতে কখনওই কার্পণ্য বোধ করেনি। যেকোনো রমণীর সান্নিধ্য চাওয়া মাত্রই পেয়ে যাওয়া তার স্বভাবে পরিণত হয়েছে। স্কুলের কতিপয় বন্ধু সমেত তার একটি নিজস্ব গোষ্ঠী আছে, নাম 'ব্যাড বয়েজ ক্লাব। ' এই ক্লাবের প্রতিটি সদস্য মনপ্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করে, True love is a myth!
এরা মেয়েদের শুধু উপভোগ করে। এই প্রক্রিয়ায় মনের কোনো ভূমিকা নেই। নেই নারী পুরুষের সম্পর্কের পারষ্পরিক শ্রদ্ধা। হয়তো সেই বয়সটাও তাদের এখনো হয়ে ওঠেনি। অজয় মাত্র সাড়ে তেইশ বছরের স্বল্প পরিসর জীবনে অজস্র মেয়েমানুষ দেখেছে। কিন্তু হলফ করে বলতে পারবে যে এই মুহূর্তে সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা দোপেয়ে স্ত্রী লিঙ্গের প্রাণীটির মতো আজব চিড়িয়া সে জীবনে এর আগে কখনও দেখেনি। ভাই-রাজার সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে মূল রাজভবনে এসেছে। কাছাকাছি আসতেই দেখতে পেলো কৃশকায় মাঝারি গড়নের একটি মেয়ে খোলা রাস্তায় চোখে বুজে ধেই ধেই করে নেচে বেড়াচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে বিস্মিত না হয়ে পারল না। বিস্ময়ের প্রাবল্যে একরকম বাধ্য হয়েই ঘোড়া থামাতে হলো।
এবার সে গম্ভীর গলায় সহচরদের বলল, ‘এই চিড়িয়াটাকে শিখিয়ে দাও, রাজকীয়দের দেখলে কুর্নিশ করতে হয়। সম্মানের সাথে কথা বলতে হয়।’
হুকুম তামিল করা হল তাৎক্ষণিক ভাবে।
-’ইনি রাজ্যের মেজো রাজকুমার। কুর্নিশ করো!’
রাশিকার মুখাখানা রাগে অপমানে থমথম করছিল। তার এত সুন্দর একটা নামকে কিনা বানিয়ে দিল ‘রশিদ কাকা’! কত বড় সাহস। হাত তুলে বিরক্ত ভঙ্গিতে বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ কুর্নিশ!’
অজয় মেয়েটির স্পর্ধা দেখে বিষম খেলো।
-’হ্যাঁ হ্যাঁ কুর্নিশ, মানে?’
-’কুর্নিশ মানেও বুঝো না?’
-’কুর্নিশ কী করে করতে হয় তুমি জানো না? সভ্য সমজে কখনো বাস করোনি?'
অজয়ের সঙ্গী দুজন অধৈর্য হয়ে উঠেছিল। একজন অত্যন্ত কঠিন গলায় বলে উঠল, ‘রাজ্যের রাজকুমারের সাথে তুমি এভাবে কথা বলতে পারো না। কঠিন শাস্তি হবে।’
রাশিকা মুখ বাঁকায়, ‘আসছে একজন রাজকুমার … রাজকুমার তো না, রাক্ষস কুমার! রাক্ষসের মতো চেহারা!’
অজয় অনেকক্ষণ ধরে মেয়েটির স্পর্ধিত আচরণ সহ্য করছিল। এবার ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। হুঙ্কার ছেড়ে বলল, ‘একে বন্দি করো!’ কথাটা বলতে বলতেই সে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। সঙ্গী দুজন মুহূর্তের মাঝে রাশিকাকে দু পাশ থেকে আটক করে ফেলল। বোকা মেয়েটা এতক্ষণে লক্ষ্য করল মানুষ দুজনের হাতে লম্বা নল ওয়ালা রাইফেল আছে। সে যে বড়সড় ভুল করে ফেলেছে তা টের পেল বড় অসময়ে। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘ভাই প্লিজ আমাকে ছেড়ে দেন। পায়ে পড়ি আপনাদের।’
--------------------------------------
ওসি সাহেবের নাম জামান। বয়স পঁয়তাল্লিশের আগে পিছে। বুট জুতো পরা পা দুটো টেবিলের ওপর রাখা। মুখের সামনে খবরের কাগজ। মেহেরুর উপস্থিতি টের পেয়েও তাকে ভদ্রস্থ হতে দেখা গেলো না। এই অসংযত আচরণের পেছনে অবশ্য কারণ আছে। বছর দেড়েক আগে একবার সে মেহেরুকে কফির দাওয়াত দিয়েছিল। তার বাড়িতে স্ত্রী আছে, দুটি ফুটফুটে সন্তান আছে। এরপরেও কফি পান করার জন্য তার অন্য নারীর সঙ্গ চাই। মেহেরু এই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে এবং ওসির স্ত্রীকে ফোন করে নালিশ করেছে। সেই ঘটনার পর থেকে ওসির চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছে সে। রানিমার বিশেষ আস্থাভাজন কর্মচারী হওয়ায় সরাসরি ওসি জামান তার কোনও ক্ষতি সাধন করেনি। তবে বলাই বাহুল্য যে, একটি যুৎসই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল লোকটা এতকাল।
মেহেরু বেশ নার্ভাস বোধ করছিল। বিচলিত ভাবে ওসির মুখোমুখি চেয়ারে বসল সে।
-’কী ব্যাপার?’
ওসি জামানের চেহারা মিলিটারিদের মতো শক্ত পোক্ত। পান খেয়ে ঠোঁট লাল। দেখলে মনে হয় হিন্দি সিনেমার পাকা ভিলেন। সে মুখে একটা হিসহিসে হাসি নিয়ে মেহেরুর দিকে … আদতে ওর বুকের যেখানটায় বেগুনি রঙের শাড়ির আঁচলটা একটু অবিন্যস্ত হয়ে আছে ঠিক সেখানে দৃষ্টি ন্যাস্ত করে বলল, ‘কেমন আছেন ম্যাডাম?’
বিশ্রী চাউনিটা দেখামাত্র মেহেরুর চোখের তারায় ক্রোধ বহ্নি প্রজ্বলিত হয়ে উঠল।
-’কী চাই? কেন ডেকেছেন?’
জামান নির্লজ্জ হাসিটা মুখে ঝুলিয়ে রেখেই বলল, ‘এতো অস্থির হচ্ছেন কেন? এসেছেন যখন একটু জিরিয়ে নিন। চা কফি কিছু খান ...ও আচ্ছা!আমার সাথে কফি খেতে তো আবার আপনার আপত্তি। তবুও আপনার জন্য আমার মনে একটা বিশেষ জায়গা আছে বুঝলেন? তাই সরাসরি রাজবাড়ির দপ্তরে খবরটা না পাঠিয়ে আপনাকেই আগে জানালাম।’
রাগে আর ঘেন্নায় মেহেরুর সারা গা রিরি করছিল। কোলের ওপর পড়ে থাকা শাড়ির আঁচলের একটা কোণ আঙ্গুল দিয়ে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে সে দাঁত খিঁচিয়ে বলল, ‘যা বলার তাড়াতাড়ি বলুন। আমার সময় নেই।’
জামান মেহেরুর সামনে একটা কাগজ এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘আপনার এই জিদাজিদির স্বভাবটা ভালো না ম্যাডাম। উপকার করতে চাইছি তাও আপনার রাগ কমে না। কী মুসিবত।’
মেহেরু চট করে কাগজটা হাতে তুলে নিল। ওখানে বড় অথচ এলোমেলো অক্ষরে লেখা,
মেহেরু, ইন্দিরাকে তুমি বাঁচাও। আমি জানি তুমিই পারবে।
-’কী আশ্চর্য! কে ইনি? আমাকে কেন এসব লিখেছে?’ মেহেরু অবাক।
-’সে প্রশ্নের উত্তর তো আপনাকেই দিতে হবে, ম্যাডাম।’
মেহেরু তীক্ষ্ণ চোখে তাকায়, ‘আপনি আমার সাথে রসিকতা করছেন?’
জামান জিব কেটে মাথা নাড়ে, ‘ছিঃ ছিঃ আপনার মতো সুন্দরীকে অপমান করব। এতবড় অমানুষ আমি না।’
এলোমেলো শ্বাস পড়ছিল মেহেরুর, ‘কে এই ইন্দিরা? আর কে লিখেছেন এই নোট? খুলে বলুন আমাকে।’
-’একজন পাগল মহিলা জঙ্গল থেকে শহরতলিতে ছুটে এসেছিল গতকাল। সেই পাগল জেলখানায়ই মৃত্যু বরণ করেছে। ‘
-’কীভাবে?’
-’আত্মহত্যা।’
-’কী? আত্মহত্যা করবে কেন?’
-’সেই বিষয়ে আপনার সাথে কথা বলার পারমিশন নেই। কথা হচ্ছে মহিলা মৃত্যুর আগে আপনাকে উদ্দেশ্য করে এই নোট লিখে গেছে। আপনি কি ইন্দিরা নামের কাউকে চেনেন?’
-’না! …’ মেহেরু ভ্রুকুঁচকে কিছু একটা মনে করার চেষ্টা করে। তারপর চিন্তিত গলায় বলে,
-’স্কুলে একজন ইন্দিরাকে চিনতাম। কিন্তু তার সাথে অনেকদিন যোগাযোগ নেই।’
-’একজন পাগল মহিলা কী বলল, কী লিখল তাতে কিছুই এসে যায় না। আপনার নামটা এখানে আছে বলেই তার ম্যাসেজটাকে গুরুত্ব দেয়া হল।’
-’ওই মহিলার নাম কী?’
-’জানা যায়নি। বহুদিন ধরে সে সমুদ্রের ধারের জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত। কারো সাথে কখনও কথা বলেছে সুস্থ ভাবে এমন নজির নেই।’
-’উনার দাফন হয়ে গেছে?’
-’হ্যাঁ আজ ভোরেই।’
মেহেরু দুশ্চিন্তায় গাঁট হয়ে বলল, ‘আপনি ব্যাপারটা আপাতত গোপন রাখুন প্লিজ।’
জামানের মুখে নির্লজ্জ হিসহিসে হাসিটা ফিরে এলো।
-’ম্যাডাম! আমি তো যা করছি আপনার ফেভারেই করছি। আপনিই তো এই বেচারাকে ভুল বুঝলেন চিরকাল। '
সেলফোনটা বাজছিল পার্সের ভেতর। মেহেরু বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। বুক কাঁপছে এক অবিদিত শঙ্কায়। জামান বলল, ‘কফির দাওয়াত টা কি এবার গ্রহণ করবেন? নাকি এবারেও আমার স্ত্রীর নম্বরে উড়ো ফোন যাবে?’
মেহেরু শীতল হাসি হেসে বলল, ‘কেন কফির দাওয়াত গ্রহণ না করলে আমাকে হেল্প করবেন না?’
জামান সজোরে মাথা নাড়ে, ‘আরে না, কী যে বলেন ম্যাডম, আপনার সুন্দর মুখটার দিকে তাকালে কি আর হেল্প না করে পারা যায়? তবে কফির দাওয়াতটা এবার আর নাকচ করবেন না প্লিজ। আপনার ভালোর জন্যই বলছি।'
মেহেরু আর কোনও কথা না বলে কাগজটা নিয়ে বেরিয়ে এলো। সেলফোনটা বেজে যাচ্ছিল তখনও। পার্স থেকে বের করে দেখল রানিমার নম্বর থেকে কল আসছে। তড়িঘড়ি করে ফোনটা ধরল সে।
-’জি রানিমা। ‘
-’তুমি কোথায়?’
মেহেরু ভয় চাপা কণ্ঠে আমতা আমতা করে বলল,’আমি ...একটু বাসায় এসেছিলাম। মা ডেকেছিল।’
-’ও আচ্ছা। এখুনি একবার দেখা করো আমার সাথে। আমি ওয়েস্ট উইং এর টেরেসে আছি। আগামীকাল ভুরিভোজের আয়োজন করা হচ্ছে জানো তো। মেনুটা ঠিক করে দেব।তুমি হেড বাবুরচিকে ইমেইল করে দিও।
-’জি নিশ্চয়ই।’
-'আর শোন, তুর্জয় যদি তোমাকে কোনও জব অফার করে, তুমি সরাসরি নাকচ করে দেবে।’
-’জি।’
এবার শব্দটা উচ্চারণ করতে গিয়ে মেহেরুর গলা কেঁপে গেলো। কেন যেন এক দুরন্ত ভয়ে শিরশির করে উঠল সর্বাঙ্গ। তুর্যয় তাকে জব অফার করবে কেন? রাজ্যে এতো এতো যোগ্যতা সম্পন্ন লোক থাকতে রাজকুমার কেন তার মতো সাধারণ একজনকে মনোনীত করতে চাইবে? আর করে থাকলেও রানিমাই বা কেন বিশেষ ভাবে সেই প্রস্তাব নাকচ করার আদেশ করছেন? এর পেছনের কারণটা কী? তিনি কি ভাবছেন, মেহেরু তুর্যয়ের অধীনে কাজ করলে তাঁর ব্যক্তিগত গোপন তথ্য পুত্রের কাছে পাচার হয়ে যাবে? সেরকম সন্দেহ থাকলে তিনি নিজমুখে পুত্রকে নিরস্ত করলেই তো পারেন। এতে মেহেরুকে জড়ানোর তো কোনো প্রয়োজন ছিল না!
-’ওকে বলবে তুমি বর্তমানে আমার ব্যক্তিগত অফিসে কর্মরত আছ। তাই অন্যদিকে সময় দেয়া তোমার পক্ষে সম্ভব না।’
মেহেরু রবোটিক গলায় বলল, ‘জো হুকুম।’
-’এখনই একবার এসো। কথাটা আজকেই ফাইনাল হয়ে যাক। আমি তোমার মতো একজন বিশ্বস্ত কর্মচারী হারাতে চাই না।’
ফোনের লাইন কাটার পর কিছুক্ষণ থম ধরে থানার সম্মুখের ঢালু ফুটপাতের ওপর দাঁড়িয়ে রইল মেহেরু। বুকের ভেতর এক দুর্বহ শঙ্কার পিণ্ডভার আটকে আছে। স্বস্তিতে নিশ্বাস ফেলা যাচ্ছে না।
এই শহরের রাস্তাঘাট পাহাড়ি। লোকে সমুদ্রকুঞ্জকে এশিয়ার স্যানফ্র্যান্সিস্কো বলে। ঠিক সেরকমই উঁচুনিচু পথঘাট। ঝকঝকে রাস্তার দুধারে কোথাও আধুনিক স্থাপত্যের বাড়িঘর আবার কোথাও ভিক্টোরিয়া যুগের রাজকীয় স্থাপনা। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে গড়ে ওঠা শহরটা ছবির মতো সুন্দর। সারাক্ষণ মেঘ এসে ভিড় জমায় শহরের বুকে।
মেহেরু রাজবাড়িতে প্রবেশ করল সন্ধ্যা নামার পর। সমুদ্রের ধারে তখন রাজার কুমারের আগমন উপলক্ষে আতশবাতি প্রদর্শনি শুরু হয়ে গেছে। কালো আকাশ জুড়ে সশব্দে ভেসে উঠছে আলোর ফুলঝুরি। দেখে মনে হয় যেন দূর স্বর্গলোকে দেবতাদের আনন্দ উৎসব চলছে। চোখ ধাঁধানো আলোয় ভেসে যাচ্ছে কালো আকাশ। শহরের বাসিন্দারা ফায়ার ওয়ার্ক্স দেখার উদ্দেশ্যে সাগর তীরে ভিড় জমিয়েছে। অনেকে দাঁড়িয়ে গেছে নিজ বাড়ির বারান্দায়। গোটা সমুদ্রকুঞ্জ মেতে উঠেছে যেন এক অন্তহীন আনন্দের উদ্দাম উৎসবে। রাজপরিবারের সদস্যরা একত্রিত হয়েছিল প্রাসাদের পশ্চিম অংশের দ্বিতীয় তলার সুসজ্জিত জাঁকজমক সোপানে। এই সোপান থেকে স্পষ্ট ভাবে আতশবাজির প্রদর্শনী উপভোগ করা যাচ্ছে। মেহেরু খুব দ্রুত পা চালাচ্ছিল। এক নাম না জানা আতঙ্কে কেন যেন তার গলা শুকিয়ে আসছে। ওই পাগল মহিলা কী কারণে তার নাম লিখতে গেল চিঠিতে? ইন্দিরা কে? সেই মেয়ের কি কোনো বিপদ হয়েছে?
এত সব গেঁজলা ওঠা হিজিবিজি দুশ্চিন্তার নর্দমার ভেতর থেকে হঠাৎ একটিমাত্র অসম্পূর্ণ, অস্পষ্ট, অসংলগ্ন ভাবনা মাথা তুলে দাঁড়িয়ে তার চিন্তারাজ্যের মোড়টা সম্পূর্ণ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিল। অন্তরের প্রতিটি বিন্দু দিয়ে সে অনুভব করল যে কিছুতেই আজ তার তুর্যয়ের মুখোমুখি হতে ইচ্ছে করছে না। ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে এটা ভেবেই ভয়, কুণ্ঠা এবং উত্তেজনা প্রেতাত্মার মতো তেড়ে এসে গলা টিপে ধরতে চাইছে। সে জানে, টেরেসে এই মুহূর্তে রাজপরিবারের প্রতিটি সদস্য উপস্থিত আছে। আছে তুর্যয়ও। রানিমার কথামতো চাকরির প্রস্তাব নাকচ করে দিলে তুর্যয় কী ভয়াবহ রেগে যাবে সেটা আর কেউ না জানলেও মেহেরু জানে। এই রাগের পরিণতি কী হবে? সে ভেবেছিল পাঁচ বছর আগের রাগটা, অপমানটা … ও নিশ্চয়ই ভুলে গেছে। ওর পরিবর্তে অন্য কেউ হলে ভুলে যেত। কিন্তু এই ছেলেটাকে অন্য কারো সাথে তুলনা করতে যাওয়াই যে মহা বোকামি মেহেরু সেটা আগে বুঝতে পারেনি। ইশ ....কী মুশকিলে যে পড়া গেলো!
No comments