গল্প | উড়ান মেঘের দেশে - পর্ব-০৭ | Oran megher deshe - Part-07
লেখিকা | ওয়াসিকা নুযহাত
সুরের সাথে আ-কার যুক্ত হবার আগ পর্যন্ত প্রকৃত অর্থে আসর জমে না। আজ যথাসময়ে আ-কার যুক্ত হওয়া স্বত্বেও আসর তেমন জমল না। মহারাজের নির্দেশে রাত এগারোটা বাজতে না বাজতেই বাদ্যবাদক, গাতক এবং নৃত্যশিল্পীরা বাদ্যযন্ত্র গুটিয়ে প্রস্থানোদ্যত হলো। মহারাজ অন্দরমহলে মাঝ রাত্তিরের আগেই ফিরে যাবেন। এমনটাই কথা দিয়েছেন পাটরানিকে।
এই মুহুর্তে তিনি গদিতে আধশোয়া হয়ে আছেন। হাতে একটি রুপার সুরাপাত্র। দুপাশে দুজন সশস্ত্র দেহরক্ষী দাঁড়িয়ে আছে। সুরার নেশায় মহারাজের চোখ কিছুটা ভারী হয়ে এসেছে। বোধবুদ্ধি এবং চিন্তাশক্তি অবশ প্রায়। দৃষ্টি ঝাপসা। তিনি জড়ানো গলায় দেহরক্ষীদের একবার বললেন, ‘আমাকে ধর। উঠে দাঁড়াব।’
আদেশ শোনামাত্র দেহরক্ষী দুজন মহারাজকে সসম্ভ্রমে জাপটে ধরল দুপাশ থেকে। ঠিক সেই সময় আয়না দিয়ে ঘেরা নাচঘরের আধো আলো আঁধারির দৃশ্যপটে একজন নারীর উপস্থিতি পরিলক্ষিত হলো। তার ছায়া প্রতিফলিত হচ্ছে চতুর্দিকের কাচের দেয়ালে। দেহরক্ষীরা ছাড়াও একজন ভৃত্য উপস্থিত আছে। যে নারীটি মাত্র নাচঘরে প্রবেশ করেছে তার পরনে শাড়ি। নাক মুখ ঢাকা কাপড় দিয়ে। সাধারণত রাজবাড়ির অন্দরমহলের মেয়েদের এখানে প্রবেশ নিষেধ। শিল্পীদের সাথে রাজপ্রাসাদ থেকে প্রাপ্ত আমন্ত্রণ পত্র থাকে।মেয়েটির হাতেও একটি আমন্ত্রণপত্র দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। দেহরক্ষীরা সেই পত্রের নামধাম মনোযোগ দিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করল না। জলমহলে নিত্য নতুন শিল্পীদের আবির্ভাব ঘটে। এটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা নয়। একজন চড়া গলায় বলল, ‘আজকে আর গান বাজনা হবে না। আপনি ফিরে যান।’
মুখোশধারী নারীটি বলল, ‘মহারাজ আমাকে ডেকেছেন। তাঁর সাথে আমার একান্তে কিছু কথা আছে। আপনারা বাইরে অপেক্ষা করুন।’
#oran_megher_deshe' '#উড়ান_মেঘের_দেশে'
'#bangla_story_143' '#banglastory143'
মহারাজ ঝাপসা দৃষ্টিতে দীর্ঘাঙ্গিনী রমণীটির দিকে তাকালেন একবার। তাঁর স্মরণে আসছে না কে এই রমণী, এবং কেন তিনি একে ডেকেছিলেন। তবে তিনি আজীবন সৌন্দর্যের একনিষ্ঠ পূজারি। নেশাচ্ছন্ন কুয়াশা ঢাকা দৃষ্টি মেলে তিনি সম্মুখে মূর্তিমতী নারীর রুপসুধা প্রত্যক্ষ করলেন। এর সর্বাঙ্গ যেন নিখুঁত ছাঁচে ঢালা কোনও ভাস্কর্য। মদির দুটি আঁখি বুঝি মায়ালকের রুপকথা! তিনি এই ছদ্মবেশী নারীর প্রকৃত চেহারা অবলোকন করার জন্য অস্থির হয়ে উঠলেন। দেহরক্ষীদের বললেন, ‘তোরা বাইরে যা। একটু পরে আসিস।’ কথাটা শেষ করে মহারাজ ধপ করে আসনে বসে পড়লেন পুনরায়। তাঁর চোখের কোণ লালচে। ঠোঁট ফোলা। কথা বলতে গিয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে জিব।
দেহরক্ষীদ্বয় এবং ভৃত্যটি প্রস্থান করার পর মেহেরু নাচঘরের কপাট বন্ধ করল। এই ঘরে সিসি ক্যামেরা অনুপস্থিত। অতএব ঘরের অভ্যন্তরে এখন যা ঘটবে তার কোনও সাক্ষ্য প্রমাণ থাকার উপায় নেই। মহারাজ গদিতে হেলান দিয়ে বসেছেন। চোখদুটো আধবোজা। মেহেরু তাঁর পায়ের কাছে এসে বসল। মুখে এখন ওড়না নেই। জাদুমন্ত্র পড়ার জন্য মহারাজের চোখ তার চোখের ওপর নিবদ্ধ হতে হবে। কিন্তু মহারাজকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি যে কোনো মুহূর্তে ঘুমে ঢলে পড়বেন। যা করার দ্রুত করতে হবে। মেহেরু বিনীত গলায় একবার ডাকল, ‘জাহাঁপনা!’
জাহাঁপনা ভারী চোখের পত্রপল্লব প্রসারিত করলেন। তাঁর মনে হল এই অসম্ভব রূপবতী মেয়েটিকে তিনি এর আগে কোথাও দেখেছিলেন। যখন দেখেছিলেন তখন বেশ মনেও ধরেছিল। রাজ্যে এমন আগুনের মতো রুপবতী বিরল। কী এক কারণ বশত মেয়েটির ওপর থেকে তিনি দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছিলেন। কারণটা নিশ্চয়ই গুরুতর ছিল। কিন্তু কী সেই কারণ তা এই মুহূর্তে কিছুতেই স্মরণে আসছে না। বৃদ্ধকালের এই এক জ্বালা। স্মৃতিশক্তির রফাদফা অবস্থা হয়। মেহেরু আরেকবার ডাকল,
মহারাজ!
এবার তার কণ্ঠ ঐন্দ্রজালিক। বুকের একদম মধ্যিখানে গিয়ে লাগে। মনে হয় ওই ডাক শুনে আকাশের দেবতারাও স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নেমে আসবে। মহারাজ চোখ তুলে তাকালেন। চারটি চোখ একত্রে মিলিত হতেই মেহেরু বিড়বিড় করে কিছু একটা উচ্চারণ করতে লাগল। মহারাজ স্তব্ধ চোখে চেয়ে রইলেন শুধু। তার সমস্ত সত্তা বিবশ। মুখে কোনো রা নেই। কয়েকটা মিনিট কেটে যাবার পর মেহেরু সম্মোহনের গলায় বলল, ‘ইশান নামের একটি ছেলেকে আপনি শাস্তি দিয়েছিলেন। চোখ উপড়ানোর শাস্তি। ছেলেটি নির্দোষ। তার শাস্তি মওকুফের ব্যবস্থা করতে হবে। আমি খালাসপত্র নিয়ে এসেছি। আপনি এটায় সই করে দিন।’
মহারাজ আজ্ঞাবহ ভৃত্যের মতো যান্ত্রিক গলায় বললেন, ‘দেব!’
-’আমি যে এখানে এসেছিলাম, এই ঘটনা আপনি বেমালুম ভুলে যাবেন। সকালে উঠে পরিষদকে জানাবেন নিজ উদ্যোগে বিশেষ বিবেচনায় ছেলেটির শাস্তি মওকুফ করেছেন। এবার এটায় সই করুন। সই করার পর আপনি ঘুমিয়ে পড়বেন। ঘুম থেকে উঠে আপনার আর এই মুহূর্তটার কথা মনে থাকবে না।’
এদিকে, রাজবাড়ির অন্দরমহলে মহারানির চিত্ত অস্থির এবং উত্তেজিত। কুঞ্চিত কপাল এবং ক্রুদ্ধদৃষ্টি সমেত তিনি কক্ষের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে পায়চারি করছেন। ঘড়িতে বাজে সাড়ে এগারটা। সভায় অবস্থান কালে মহারাজ ফোন সাথে রাখেন না। রানিমা ভৃত্য মারফত কয়েক দফা খবর পাঠিয়েছেন। একজন ভৃত্য জানিয়েছে মহারাজ নাচ গানের লোকদের বিদায় করে দিয়েছেন বহু আগে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজভবনে পদধূলি রাখবেন। এই খবর আসার পরেও আরও চল্লিশ মিনিট গত হয়েছে। কিন্তু মহারাজের আগমনের চিহ্নমাত্র নেই। কিছুক্ষণের মধ্যে খবর এলো নাচঘরে এই মুহূর্তে শুধুমাত্র একজন রমণী বাদে অন্য কারো উপস্থিতি নেই। উর্মিলা সর্পিনীর ন্যায় ফুঁসে উঠে বললেন ‘কে এই রমণী? কী নাম তার?'
খানিক বাদে মহারাজের দেহরক্ষীদের মাধ্যমে জানা গেলো একজন মুখোশধারী নারী মহারাজের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে নাচঘরে প্রবেশ করেছিল। উল্লিখিত নারী মহারাজের সাথে একান্তে কিছু সময় কাটায়। এবং একটা সময় মহারাজ নাচঘরের আসনেই ঘুমিয়ে পড়েন।
এই ঘটনা জানতে পেরে মহারানি ভয়ঙ্কর রোষানলে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়লেন। আদেশ দিলেন অতি দ্রুত যেন এই ব্যাভিচারিণীর আসল পরিচয় উদ্ধার করা হয়।
----------------------
রাশিকাকে বাবুর্চিদের কোয়ার্টারে প্রথমেই জায়গা দেয়া হলো না। তার প্রাথমিক ঠিকানা হলো মূল রাজভবনের নিচতলার একটি কক্ষ। এই কক্ষের বাতায়ন পার্শ্বস্থ ল্যাভেন্ডার বাগানটি অতি মনোরম। বাগানের একপ্রান্তে মহারানির দপ্তর খানা। অপরপ্রান্তে মাঝারি আকৃতির ফোয়ারা। রাশিকা সমুদ্রকুঞ্জে আগমনের পর থেকে যা দেখছে তাতেই মুগ্ধ হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হয়েছে বিশাল বড় রসুইঘর দেখে। সে কল্পনাও করতে পারেনি যে রান্নাঘর কখনো এত সুসজ্জিত, বিস্তৃত এবং চটকদার হতে পারে। কিন্তু হেডবাবুর্চি লোকটাকে বিশেষ সুবিধার মনে হয়নি। মুখটা সারাক্ষণ আমের মতো বাঁকা করে রাখে। রাগী কণ্ঠস্বর। রাশিকার সাথে কথা বলেছে এমন ভঙ্গিতে যেন রাশিকা তার স্কুলে সদ্য ভর্তি হওয়া ক্লাস ওয়ানের ছাত্রি। অন্য বাবুর্চিরা অবশ্য বিদেশি শেফ হিসেবে তাকে বেশ খাতির যত্ন করেছে। গত বছর রাজা রানি বাংলাদেশ সফরে গিয়েছিলেন। বাংলাদেশের রান্না খেয়ে তাঁরা অতিশয় মুগ্ধ। সফর শেষে সমুদ্রকুঞ্জে ফিরে আসার পর থেকেই বাংলাদেশের একজন শেফ ভাড়া করে আনার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ইন্টারভিউর অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে রাশিকা চাকরিটা পেয়ে গেল।
রাশিকার জন্য বরাদ্দ ঘরে একটি রাজকীয় পালঙ্ক আছে। আছে শত বছরের পুরনো কাঠের কারুকার্য খচিত আয়না। ঘরের কোণায় ইয়া লম্বা এক বর্মপোশাক ধারী মূর্তি। দেখে মনে হয় যেন এখুনি রণক্ষেত্র থেকে ফিরেছে। হা করে তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ রাশিকা মূর্তিটার দিকে। আর ঘরের পশ্চিম কোণের দেয়ালে একটি তরুণী মেয়ের ছবি টাঙ্গানো আছে। একটু ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় চিত্রকর্ম। এতো নিখুঁত, যে প্রথম দেখায় রক্তমাংসের জীবন্ত মানুষের ছবি বলে ভ্রম হয়। মনে হয় যেন মেয়েটি ছবির ভেতর থেকে এখুনি কথা বলে উঠবে।
#oran_megher_deshe' '#উড়ান_মেঘের_দেশে'
'#bangla_story_143' '#banglastory143'
রাজবাড়িতে ঘুরে ঘুরেই আজকের সন্ধ্যেটা কাটল তার। প্রাসাদের বারান্দায় আকাশজোড়া মেঘের মধ্যে ডুব দিয়ে মনে হয়েছে সে যেন সত্যিই কোনও রুপকথার রাজ্যে চলে এসেছে। বারান্দায় দাঁড়ালেই সমুদ্রের গর্জন শোনা যায়। কী সুন্দর! আহা কী যে সুন্দর! এই সৌন্দর্য দেখে মনের আনন্দে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ধেই ধেই করে নৃত্য করেছে কিছুক্ষণ। ভাগ্যিস কেউ দেখেনি। অবশ্য দেখলেও বা ক্ষতি কী? মনের আনন্দে নৃত্য করাটা তো কোনও অপরাধ নয়। দেশে ভিডিও কল করে বাবা মা এবং বন্ধু বান্ধবদের রাজপ্রাসাদ দেখিয়েছে। উঁচু পালঙ্কের ওপর উঠে ইচ্ছে মতো লাফঝাঁপ করেছে। মনটা একদম প্রজাপতির মতো ফুরফুর করে উড়ছিল। টুইটারে তুর্যয় একটি নতুন স্ট্যাটাস দিয়েছে।সেই স্ট্যাটাস দেখে উড়তে থাকা মনের ডানা খসে পড়তে খুব বেশি সময় লাগল না। রাজপুত্র লিখেছে,
কামিং হোম! হেভেনলি ফিলিং আফটার সো লং। ক্যান্ট ওয়েইট টু মিট মাই চাইল্ডহুড ক্রাশ!
সহস্র মানুষ সেই স্ট্যাটাসের ওপর হামলে পড়েছে। রাজকুমারের চাইল্ডহুড ক্রাশ আদতে কে, সেই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য উদগ্রীব জনতার অভাব নেই। রাশিকার মনটা অত্যধিক খারাপ হয়ে গেল। প্রাসাদের একজন কর্মচারীর কাছ থেকে মেহেরুর নম্বর যোগাড় করল। তখন ঘড়িতে বাজে রাত সাড়ে বারোটা। মেহেরু মাত্র বিছানায় শুয়েছে। খালাশ পত্রে মহারাজের সই নিয়ে একজন ভৃত্য মারফত কাগজটা বন্দিশালার দপ্তরে পাঠিয়ে দিয়েছিল। নিজেকে ইচ্ছে করেই আড়াল রেখেছে। যেন কারো মনে কোনো সন্দেহের উদ্রেক না হয়। ভৃত্যটি জানিয়েছে বন্দিশালার দাপ্তরিক নিশ্চয়তা দিয়েছে ভোরবেলা ছেলেটিকে খালাস করে দেয়া হবে। তবুও মেহেরুর বুকের ভেতর একটা দুশ্চিন্তার বুদবুদ উঠছিল থেকে থেকে। কোনভাবে তার এই গোপন অভিসার ফাঁস হয়ে গেলে কী উপায় হবে? দুশ্চিন্তায় ঘুম আসছিল না। অচেনা নম্বরের ফোন পেয়ে কুঞ্চিত ভ্রু নিয়ে সে কল রিসিভ করল, ‘হ্যালো কে?’
-’আপা, আমি রাশিকা!’
-’রাশিকা কে?’
-’বাংলাদেশ থেকে আসা শেফ।’
একটু সময় লাগল মেহেরুর মেয়েটিকে চিনে নিতে।
-’ও আচ্ছা! কী খবর? এত রাতে? সব ঠিক আছে তো?’
রাশিকা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘আপা তুর্যয়ের চাইল্ডহুড ক্রাশের ব্যাপারে তো আপনি আমাকে কিছু বলেননি।’
মেহেরু একটু বিব্রত এবং বিরক্ত বোধ করল। কঠিন এবং রুক্ষ একটা দিনের শেষে এসব ঠুনকো বিষয় নিয়ে আলাপ করার কোন উদ্যম তার ভেতরে নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বলল,
-’এরকম কিছু তো বলার কথা ছিল না আপনাকে।’
-’কিন্তু আপা, কে এই মেয়ে? একটু বলবেন প্লিজ?’
-‘আপনি কী করে জানতে পারলেন বিষয়টা?’
-’টুইটারে।’
মেহেরু একটু চমকলাগা গলায় বলল, ‘কী লিখেছেন বড় কুমার?'
রাশিকা স্ট্যাটাস পড়ে শোনালো। শুনে টুনে মেহেরু মুখে কুলুপ এঁটে বসে রইল খানিকক্ষণ। রাশিকা অস্থির ভাবে বলল, ‘আপনি কি কিছু জানেন আপা?’
-’প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে রিয়ার সাথে রাজকুমারের ছোটবেলায় খুব বন্ধুত্ব ছিল। ওর কথাই বলেছে নিশ্চয়ই।’
রাশিকা ক্যাটক্যাট করে বলল, ‘ওই শাঁকচুন্নির নাম তাহলে রিয়া?’
মেহেরু ক্লান্ত বোধ করছিল, আলোচনায় ইতি টানার উদ্দেশ্যে বলল, ‘আপনি কি আর কিছু বলবেন? আমি ঘুমাতে যাব ।’
-’কাল একবার দেখা হবে?’
-’কাল বড় প্রচুর ব্যস্ততা সারাদিন। মনে হয় না দেখা হবে।’
-’আপা, আপনাদের দেশে একটা ট্রু লাভ ট্রি আছে না? সেই গাছটা সম্পর্কে আমাকে একটু বলবেন?’
-’এসব কুসংস্কার আপনি বিশ্বাস করেন?’
#oran_megher_deshe' '#উড়ান_মেঘের_দেশে'
'#bangla_story_143' '#banglastory143'
-’যা রটে তা কিছু তো বটে, তাই না?’
-’সাগর পাড়ের অরণ্যের একটি বিশেষ অংশকে লোকে পারুলবন বলে। পারুলবনে একটি দেবতরু গাছ আছে। গাছটির আঞ্চলিক নাম প্রণয়বৃক্ষ বা ট্রু লাভ ট্রি। এই বৃক্ষের ফুলে রংধনুর চারটি রঙের প্রলেপ থাকে বিধায় এই ফুলকে বলা হয় রংধনু ফুল। কথিত আছে এই ফুল কেউ ভালোবাসার মানুষকে উপহার দেবার পরদিন ফুলের গায়ে প্রকাশ্য ভাবে চার রঙের পরিবর্তে যদি রংধনুর সাত রং ফুটে ওঠে তবে বুঝতে হবে সেই ভালোবাসা অকৃত্রিম।’
রাশিকা গদগদ গলায় বলল, ‘ওয়াও! আমি নিশ্চয়ই এই ফুল দিয়েই রাজকুমারকে প্রপোজ করব। আপা, রাজকুমারের সাথে আমার সাক্ষাতটা কখন হবে?’
এবার সত্যি খুব রাগান্বিত বোধ করল মেহেরু, ‘আমি কী করে বলব? আমিও তো প্রাসাদের একজন সামান্য কর্মচারী। রাজপরিবারের ওপর কোনও ইনফ্লুয়েন্স আমার নেই। এটুকু জেনে রাখুন প্লিজ।’
কথাটা বলে সে ফোন কেটে দিল। কাটবার পর হঠাৎ করেই মনটা খুব বিষণ্ণ হয়ে উঠল।বেচারি মেয়েটাকে এত কড়া ভাবে কথাগুলো না বললেই পারত। কেন যে হুট করে মেজাজ অমন চড়ে গেলো কে জানে। তবে এরকম বেকুব মেয়েছেলে সে জীবনে খুব একটা দেখেছে বলে মনে পড়ে না। কিশোরী বয়সে এসব পাগলামো মানায়। একজন প্রাপ্তবয়স্কা মেয়ের কাছ থেকে এহেন ছেলেমানুষি আশা করা যায় না। তুর্যয়ের সাথে দেখা করে হবেটা কী? এই মেয়ের কি মনে মনে প্রিন্সেস হওয়ার সাধ জেগেছে নাকি? বোকা মেয়ে! সে তো জানে না, এই রাজকীয় জীবনের সবটাই মিথ্যে জাঁকজমক দিয়ে পরিপূর্ণ, কোথাও একরত্তি সত্য নেই, সততা নেই, শান্তি নেই! রাজা রানি আর রাজপুত্র কন্যাদের জীবনে শুধু বাইরের চমকটাই আছে, ভেতরটা সারশূন্য।
তুর্যয় কি কখনও কোনও মেয়েকে সত্যিকারের ভালবাসতে পারবে? পৃথিবীর নানা জায়গার নানা বয়সের অজস্র নারী যে পুরুষের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেবার জন্য সদা প্রস্তুত সেই পুরুষের কি কখনও একজন মাত্র নারীতে মন মজবে? রাশিকা মেয়েটা আস্ত গাধা। ও জানে না যে পুরুষদের কখনও বিশ্বাস করতে নেই। ওরা শুধু মেয়েদের শরীরটাকেই চেনে। মনকে নয়। জীবনে কত পুরুষই তো তার শরীরের ওপর নজর দিল, কই? মনের ওপর তো কারো কখনও নজর পড়ল না! একজনের হয়তো পড়েছিল। কিন্তু সে অনেককাল আগের কথা। বাল্যকালে মানুষের কতরকম মতিভ্রম ঘটে! বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে মনটাও বড় হয়। বুদ্ধি বিবেচনার দ্বার উন্মোচিত হয়। ছোটবেলার ভালোলাগা গুলো বড় বেলার উর্বর মস্তিষ্কে ভুল হয়ে ধরা দেয়।
মেহেরুর দুর্ব্যবহার রাশিকার মনে বিন্দুমাত্রও প্রভাব ফেলেনি। বরং সে ভাবছে রিয়া নামের শাঁকচুন্নিটার কথা। ভাবতে গিয়ে তার অন্তর বিষিয়ে উঠছে। বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল কে জানে, ঘরের বাতিটাও নেভানো হয়নি। হঠাৎ মনে হলো কেউ একজন খসখস শব্দ তুলে হাঁটছে। ঘুমো চোখের পাপড়ি মেলতেই দেখল ঘরের মধ্যিখানে একজন তরুণী মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোথায় যেন দেখেছে সে এর আগে মেয়েটিকে। কোথায় দেখেছে? মনে পড়ছে না তো!
-’কে তুমি ভাই? কী চাও?’ ঘুমের ভেতর থেকেই কথা বলে উঠল রাশিকা। মেয়েটি তার দিকে আরও কয়েক পা এগিয়ে এলো। যেন খুব গোপন কিছু বলবে এমন ভাবে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘আমি ইন্দিরা। আমাকে এই ছবির ভেতর বন্দি করে রাখা হয়েছে। তুমি আমাকে মুক্তি দেবে?’
#oran_megher_deshe' '#উড়ান_মেঘের_দেশে'
'#bangla_story_143' '#banglastory143'
ধড়ফড়িয়ে শোয়া থেকে উঠে বসল রাশিকা। বড় বড় শ্বাস পড়ছে তার। চোখদুটি ছানাবড়া। আশেপাশে কেউ নেই। বিছানার সাথে লাগোয়া জানালা গলে কয়েক টুকরো ধোঁয়াটে মেঘ এসে ভিড়েছে ঘরের ভেতর। চকিতে একবার তাকালো সে দেয়ালে টাঙ্গানো ছবিটার দিকে। স্বপ্নে সে এই মেয়েটিকেই দেখেছে। একটা ঠান্ডা শিরশিরে ভয়ে গা শিউরে উঠল। বিছানা থেকে নেমে এক গ্লাস পানি পান করল ঢকঢক করে। দূরে কে যেন বাঁশি বাজাচ্ছে। জানালায় এসে দাঁড়ালো সে। ল্যাভেন্ডার বাগানের ওপর যেন মেঘের পসরা সেজেছে। অন্ধকারে সাদা পালকের শঙ্খচিলের মতো উড়ে বেড়াচ্ছে তারা। পাহাড়ের নিচে সাগর গর্জন করে চলেছে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে। সাগরের ডাক, ঝিঁঝিঁ পোকার সরব কোলাহল আর বাঁশির করুণ সুর নিশি রাতের এই নিঃশব্দ প্রকৃতিতে একটা আশ্চর্য মায়ার কুহক সৃষ্টি করেছে। কে বাঁশি বাজায় এতো সুন্দর করে? এত রাতে?
------------
নিয়মিত পাঠক, ভালোলাগা মন্দলাগা গুলো জানাবেন।
No comments