গল্প | উড়ান মেঘের দেশে - পর্ব-০৬ | Oran megher deshe - Part-06

 লেখিকা | ওয়াসিকা নুযহাত 

উড়ান মেঘের দেশে, oran megher deshe

মেহেরু রাজবাড়ির অন্দরমহলে প্রবেশ করল সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ। সরাসরি চলে এলো রাজকন্যার

শয়ন কক্ষে। সাধারণত নীহারিকা এ সময় পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু আজকের চিত্র ভিন্ন। মেহেরু দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেল উঁচু রাজকীয় পালঙ্কের ওপর রাজকন্যা এবং তার সখী শীর্ণ মুখে বসে আছে। খোলা বাতায়নের বাইরে সন্ধ্যার কালচে নীল আকাশ। কক্ষের অভ্যন্তরে কোন বাতি জ্বলছে না। সন্ধ্যার আবছা আলোর ভেতরেও পালঙ্কের ওপর বসে থাকা দুই তরুণীর মুখজোড়া বিচলিত এবং ভীত ভাবটা মেহেরুর চোখে প্রকট ভাবে ধরা পড়ল। বড় রাজকুমারের মহলের কাজ অসমাপ্ত রেখেই চলে আসতে হয়েছে তাকে। রানিমা এ বিষয়ে জানতে পারলে বিপদে পড়তে হবে। তবে মেহেরু মনে মনে একটি বাহানা সাজিয়ে ফেলেছে ইতোমধ্যেই। রানিমার কানে কথাটা গেলেই সে বলবে নীহারিকার একটি অংক বুঝতে সমস্যা হচ্ছিল বিধায় তাকে জরুরি তলব করা হয়েছে। সেদিকটা নাহয় সামলে নেয়া যাবে। কিন্তু নীহারিকার বিপর্যস্ত চেহারা দেখে মনে হচ্ছে বড় রকমের কোন বিপদ হয়েছে। সমুদ্রকুঞ্জের একমাত্র রাজকন্যার জীবনে মুখভার করার কোন অবকাশ নেই। না চাইতেই পৃথিবীর সব সুখ তার পায়ের তলায় এনে জড়ো করা হয়। তবুও রাজকন্যার প্রায়শই কারণে অকারণে মুখ ভার হয়। বিষণ্ণতায় ভারী হয়ে আসে পটলচেরা অনিন্দ্য সুন্দর আঁখি দুটি। এই বিষণ্ণতার পেছনের কারণটা মেহেরু বোঝে। যে বয়সটা উচ্ছল হরিণীর মতো ছুটে বেড়াবার, পৃথিবীকে, জীবনকে তিলেতিলে আবিষ্কার করার, সেই বয়সে এই বেচারি মেয়েটি হয়ে আছে পুরোপুরি প্রাসাদবন্দি! রাজবংশীয় রক্তের অধিকারী হওয়াও যে কারো কারো জীবনে অভিশাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে, সেই মর্মান্তিক সত্যটা টের পাওয়া যায় প্রাসাদবন্দি এই রাজকন্যাকে দেখলে। মেহেরু একটি চেয়ার টেনে নিয়ে বসল, ‘কী ব্যাপার? ঘটনা কী?’

নীহারিকা এক নিশ্বাসে খুলে বলল পুরো ঘটনা। মেহেরু জহুরি চোখে তরুণী রাজকন্যাকে কয়েক পলক দেখে নিল। আস্তাবলের একজন সাধারণ কর্মচারীর প্রতি এতটা করুণার পেছনের কারণ কী? শুধুই মানবিকতা? নাকি এই করুণার সাথে অন্য কিছু মিশে আছে? নীহারিকার বয়সটা ভালো নয়। এই বয়সে মানুষ আবেগের বশবর্তী হয়ে গর্হিত কাজ করতেও পিছপা হয় না। 

'#oran_megher_deshe' '#উড়ান_মেঘের_দেশে'
'#bangla_story_143' '#banglastory143'


-’কতক্ষণ আগে ঘটেছে এই ঘটনা?’


-’ছটার দিকে।’ নীহারিকার গলা কাঁপছিল।  


-’ছেলেটি কি সত্যিই শতভাগ নির্দোষ?’ 


উত্তর দিল মণিকা, ‘হ্যাঁ শতভাগ নির্দোষ। আমরা নিজেদের মধ্যে দুষ্টুমি করছিলাম। ইশানের কোনো দোষ নেই। খবর পেয়েছি মহারাজ নাকি ওর চোখ তুলে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। আপা প্লিজ তুমি কিছু করো। ছেলেটাকে বাঁচাও।’  


-’এক ঘণ্টা হয়ে গেছে। এর মাঝে যদি পানিশমেন্ট এক্সিকিউট হয়ে যায় তাহলে আমার কিছু করার থাকবে না। আর এক্সিকিউট না হয়ে থাকলেও আমি কতদূর কী করতে পারব জানি না।’ 


চিন্তিত শোনায় মেহেরুর গলা। নীহারিকা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। এক অনভিপ্রেত অদম্য কষ্টে তার বুক ভেঙে যাচ্ছে। নিরীহ একটা মানুষের জলজ্যান্ত দুটি চোখ খুবলে তোলা হবে। এতটা নিষ্ঠুর কী করে মানুষ হয়? 


মেহেরু বলল, ‘দ্যাখো, রাজবাড়িতে এসব শাস্তির প্রথা হাজার বছর ধরে প্রচলিত। রাজবংশের কন্যা হিসেবে তোমাকে সাহসী হতে হবে। এতো অল্পেই ভেঙে পড়লে চলবে না।’ 


নীহারিকা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘কিন্তু দোষ তো আমার! আমিই ওকে খেলার ছলে শাস্তি দিয়েছিলাম। তাহলে আমার চোখ তুলে নেয়া হোক। নিরীহ মানুষটাকে ছেড়ে দেয়া হোক!' 


রাজকন্যার উক্তি শুনে মেহেরু বিস্মিত না হয়ে পারল না। বিস্ময়ের পাশাপাশি তার বুকে একটু অহংবোধেরও সঞ্চার হল ক্ষণিকের জন্য। কারণ এই মেয়েটিকে ছোটবেলা থেকে সে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার চেষ্টা করেছে। মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। আজ এক সামান্য আস্তাবলের কর্মচারীর জন্য তার এই অশ্রুজল বিসর্জন মনুষ্যত্বের পরিচয় বহন করে। কিন্তু স্বয়ং মহারাজ যদি শাস্তির নির্দেশ দিয়ে থাকেন তাহলে সেই শাস্তি প্রত্যাহার করার ক্ষমতা রাজ্যের অন্য কোন ব্যক্তির নেই। মহারাজের কাছ থেকেই শাস্তি প্রত্যাহারের আদেশ আসতে হবে। যেটা এই মুহূর্তে মেহেরুর কাছে অসম্ভব ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে। সে কক্ষের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পায়চারি করতে করতে খুব দ্রুত চিন্তা করতে লাগল। প্রহরীদের মধ্যে বিশ্বস্ত একজনকে তার চেনা আছে। নাম সিদ্দিক । এর আগেও ছেলেটি তাকে নির্দ্বিধায় নানা কাজে সাহায্য করেছে। মেহেরু পার্স থেকে সেলফোন বের করে সিদ্দিককে কল করল। সিদ্দিক জানালো ইশানের ব্যাপারে তার কাছে কোনও হাল নাগাদ নেই। মেহেরু তাকে তথ্য সংগ্রহ করার নির্দেশ দিল। মিনিট দশেকের মধ্যেই জানা গেলো, ইশানকে রাজপুরীর বন্দিশালায় আটক করে রাখা হয়েছে। আগামীকাল ভোর ছটার সময় অপরাধীর চক্ষু উৎপাটন করা হবে। শাস্তি কার্যকর হবার আগে ইশান তার বাবা এবং ভাইকে এক নজর দেখার শেষ ইচ্ছা জ্ঞাপন করেছে। আজ রাতের মধ্যে তার পরিবারের সদস্যরা রাজবাড়িতে উপস্থিত হবে।


এখন অবধি ইশান অক্ষত অবস্থায় আছে, এ ব্যাপারে আশ্বস্ত হবার পর কক্ষে উপস্থিত তিন রমণী স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। নীহারিকা অনুনয় বিনয় করে মেহেরুকে বলল, ‘আপা প্লিজ! তুমি কিছু একটা কর। সত্যি যদি ইশানের চোখ উপড়ে ফেলা হয় তাহলে আমি নিজেকে কখনও ক্ষমা করতে পারব না।’ 

'#oran_megher_deshe' '#উড়ান_মেঘের_দেশে'
'#bangla_story_143' '#banglastory143'


-'তুমি তো জানো মহারাজ যে শাস্তির আদেশ নিজ মুখে ঘোষণা করেছেন সেই শাস্তি বাতিল করার সাধ্য রাজ্যের কারুর নেই। রানিমা কিংবা প্রধানমন্ত্রীরও সেই এখতিয়ার নেই। আমার মতো সাধারণ একজন কর্মচারীর পক্ষে কি মহারাজের দেয়া আদেশ নিয়ে কথা বলা মানায়?' 


-’আমি জানি তুমি পারবে। তুমি ছোটবেলায় একবার আমাকে বলেছিলে তোমার নাকি ম্যাজিক আছে। আজ তোমার সেই ম্যাজিক কাজে লাগাও আপা। প্লিজ!' 


মণিকার সামনে জাদুর ব্যাপারটা উঠে আসায় মেহেরু একটু বিব্রত বোধ করল। কড়া গলায় বলল, ‘ওটা তো ছোট বেলায় তোমার মন ভুলাবার জন্য মিছিমিছি বলেছিলাম। বোকা মেয়ে, ম্যাজিক বলে কিছু আছে নাকি পৃথিবীতে? তুমি বিজ্ঞানের ছাত্রী হয়ে এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করলে চলবে?’ একটু থেমে আবার বলল, ‘যাই হোক, আমি দেখি কিছু করা যায় কিনা। রানিমার সাথেই কথা বলতে হবে।’  


বলল মেহেরু, কিন্তু সে জানে রানিমার সাথে এ ব্যাপারে কথা বলে আদতে কোনও স্বার্থ উদ্ধার হবে না। অলকতলা গ্রামের সেই বুড়ো গণক রানিমাকে কী কুবুদ্ধি দিয়েছে কে জানে, রানিমা তার একমাত্র কন্যসন্তানকে পৃথিবীর কোন পুরুষের সম্মুখেই উপস্থাপন করতে রাজি না। মেহেরু জানে নেপালের রাজবংশের এক সদস্যের সাথে নীহারিকার বিয়ের কথা চলছে। মহারাজ মৃত্যুর আগেই এই বিয়ের অনুষ্ঠান সমাধা করে যেতে চান। বিবাহের আগ পর্যন্ত কোনও পুরুষ যেন নীহারিকার চোখে চোখেও চাইতে না পারে সেই ব্যবস্থায় কোনও ত্রুটি রাখেননি রানিমা। এখন মেহেরু যদি আস্তাবলের ছেলেটার সুপারিশ নিয়ে রানির কাছে যায় …… নাহ, রানিমাকে এই ব্যাপারে জড়ানোটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাছাড়া রানিমার প্রস্তাব যে মহারাজ মেনে নেবেন এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। যা করার মেহেরুকেই করতে হবে। দ্রুত করতে হবে। মেহেরু রাজকন্যার কক্ষ থেকে বেরিয়ে পুনরায় ফেরত গেলো বড় কুমারের মহলে। এর মাঝে খোঁজ নিয়ে জানতে পারল মহারাজ বীরবল আজকের রাত জলমহলে কাটাবেন। সাজসজ্জার কাজের তদারক করতে করতেই মনে মনে পরিকল্পনাটা সাজিয়ে ফেলল মেহেরু। তার মতো সাধারণ এক রমণীর জন্য এই পরিকল্পনা অতিমাত্রায় দুঃসাহসিক। কিন্তু নীহারিকার মুখের দিকে চেয়ে এই ঝুঁকি তাকে নিতেই হচ্ছে। এই বালিকাটিকে সে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে স্নেহ করে। মুখ ফুটে কোনদিন এই বালিকা তার কাছে কিছু চায়নি। এই প্রথম কিছু চাইল। এই চাওয়াটুকু মেহেরুকে যে করেই হোক পূরণ করতে হবে।      

'#oran_megher_deshe' '#উড়ান_মেঘের_দেশে'
'#bangla_story_143' '#banglastory143'

-------------------------------

মহারাজ এখন কিঞ্চিৎ সুস্থ বোধ করছেন। মহারানীর কক্ষ সংলগ্ন অলিন্দের একটি আরাম কেদারায় পিঠ এলিয়ে দিয়ে বসে আছেন তিনি। গুনগুন করে একটি গানের কলি আওড়াচ্ছেন। এর মানে তার মন মেজাজ এই মুহূর্তে সুপ্রসন্ন। পাশেই একটি কারুকার্য খচিত কাঠের টেবিলে হুকোর স্ট্যান্ড রাখা। তিনি গানের তালের সাথে সাথে পা নাচাচ্ছেন এবং ক্ষণকাল পর পর হুকোয় টান দিচ্ছেন। তাঁর পরনে সিল্কের পাঞ্জাবি এবং পাজামা। গলায় স্বর্ণের চেইন। মুখের দাড়ি কামানো। চুল পরিপাটি। তাঁর বয়স আটান্ন। রাজাধিরাজ পুরুষের জন্য এটা কোনও বয়সই নয়।ঘাতক ব্যধিটি দ্বারা আক্রান্ত হবার আগ পর্যন্ত মহারাজ মনের দিক থেকে ছিলেন পঁচিশ বছরের টগবগে যুবক। অসুখের আক্রমণ তাঁর বয়স যেন তরতর করে বাড়িয়ে দিয়েছে। 


সম্মুখে বিস্তৃত খোলা আকাশ। সন্ধ্যাতারা জ্বলছে মিটমিট করে। উত্তাল বাতাসে দূর থেকে সমুদ্রের গর্জন ভেসে আসছে। নিচে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িগুলোতে আলো জ্বলছে। জ্বলছে আঁকাবাঁকা রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ির হেডলাইট। ঝাঁক বেঁধে প্রাসাদের চারিধারে ঘুরে বেড়াচ্ছে সাদা পাখনার উড়ান মেঘের দল। কিছু কিছু দলছুট মেঘ পথ ভুল করে প্রাসাদের অলিন্দে এসে ভিড়েছে। মহারানি উর্মিলা মহারাজের নিকটে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি কিছু একটা বলতে চান। কিন্তু কোনও কারণ বশত কথাটা মুখ ফুটে বলতে পারছেন না। প্রায় দশ বারদিন পর মহারাজের মর্জি হয়েছে পাটরানির সাথে একান্তে কিছু সময় কাটানোর। এই বিশেষ মুহূর্তটি উর্মিলা বৈষয়িক আলাপ আলোচনা করে নষ্ট করতে চান না। কিন্তু কথাটা একেবারে না বললেই নয়। আজকের পর আবার মহারাজকে কখন একটু একান্তে পাওয়া যাবে সে বিষয়ে সংশয় আছে। মহারাজ হুঁকোতে টান দিয়ে বললেন, ‘তুই কি আমাকে কিছু বলতে চাস?’


ঊর্মিলা মহারাজের ডান বাহুট টিপতে টিপতে বললেন, ‘একটা কথা বলার ছিল।’ 


-’বলে ফ্যাল। কী চাই তোর?’ 


-’যা চাইব, তাই যে পাবো তার কি কোনও নিশ্চয়তা আছে জাহাঁপনা?’ 


-'চেয়েই দ্যাখ না। তুই আমার কাছে কী, তোকে আমি কতটা ভালোবাসি সেই বিষয়ে আজো সন্দেহ আছে? 


ঊর্মিলা গলায় অভিমানের ঝংকার ফুটিয়ে তোলে,

'#oran_megher_deshe' '#উড়ান_মেঘের_দেশে'
'#bangla_story_143' '#banglastory143'

-’এসব শুধু আপনার মুখেরই কথা। জলমহলের নটীদের কাছে গেলেই তো আমাকে বেমালুম ভুলে বসে থাকেন। সব জানা আছে আমার।’ 


মহারাজ প্রশ্রয় মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, -’অন্য কারো সাথে কি আর তোর তুলনা চলে? ওরা শিল্পী। আমি শিল্পের সমঝদার বলে ওদের শ্রদ্ধা করি। এর চেয়ে বেশি কিছু না। তুই যে আমার জীবন প্রদীপ। তুই আছিস বলেই আমি বেঁচে বর্তে আছি এখনও। এ কথা কি তোর অজানা?' 


ঊর্মিলার কণ্ঠ আবেগে রুদ্ধ হয়ে আসে। স্বামীর জন্য এক বুক ভালোবাসা টলমল করে তাঁর বুকের ভেতর। লঘু গলায় বলেন,  


-’আজকের রাতটা আমার এখানেই থাকুন।’ 


-’আজকে যে গানের নেশায় পেয়েছে আমাকে! জলমহলে শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়ে গেছে।'  


-’গান শুনুন, ফুর্তি করুন, তাতে কোনও আপত্তি নেই। আমি অপেক্ষা করব। আপনি মাঝ রাত্তিরের আগেই আমার কাছে ফিরে আসবেন, কেমন?’ 


একটু মুশকিলে পড়ে গেলেন মহারাজ। সাধারণত নাচ গানের আসরে বসলে তাঁর হুঁশ জ্ঞান লুপ্ত হয়ে পড়ে। চোখের নিমেষে রাতভোর হয়ে যায়। কিন্তু উর্মিলার আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে না আবার গানের আসর খারিজ করতেও মন চাইছে না। তিনি কিঞ্চিৎ দ্বিধাজড়িত কন্ঠে বললেন, ‘ঠিক আছে। আমি ফিরে আসব।’     


-’বড় কুমারের বিয়ের ব্যাপারে আপনি কিছু ভাবছেন?’ গুরুত্বপূর্ণ কথাটি এতক্ষণে পাড়লেন উর্মিলা। 


মহারাজ কিয়ৎ সময় চুপ থেকে বললেন,’প্রধানমন্ত্রী জাফরের কন্যার সাথে আমাদের বড় কুমারের বেশ মেলামেশা ছিল ছোট বেলায়। আমার ধারণা তাদের বন্ধুত্ব প্রণয়ে রুপ নিয়েছে এতদিনে। জাফর আমাকে আকার ইঙ্গিতে বুঝিয়েছে কন্যা সম্প্রদানের জন্য তারা প্রস্তুত। ‘ 


-’রাজ্যের যুবরাজের জীবনসঙ্গী নির্বাচন করায় কোনও তাড়াহুড়া করা ঠিক হবে না। আজ বাদে কাল সে পাটরানি হবে। তাই এই ব্যাপারে আপনি কোনও ঝটিকা সিদ্ধান্ত নেবেন না মহারাজ। অনুরোধ রইল। ‘ 


মহারাজ চুপ করে হুঁকোয় টান দিতে লাগলেন। উর্মিলা বললেন, ‘নেপাল থেকে অতিথি আসছে আগামী সপ্তাহে। আপনি তো জানেন।’ 

'#oran_megher_deshe' '#উড়ান_মেঘের_দেশে'
'#bangla_story_143' '#banglastory143'

-’হুম।’ 


-’আমি চাই নীহারিকার বিবাহর কাজটা অতি দ্রুত সম্পন্ন হোক। রাজকুমারদের কিছুটা বিলম্ব হলেও সমস্যা নেই।’ 


-’মৃত্যুর আগে আমি সন্তানদের যথোপযুক্ত ব্যাবস্থা করে দিয়ে যাব। এ নিয়ে তুই চিন্তা করিস না।’  


-’মেজো কুমার অজয়ের শরীরটা ভালো নেই। আজ সারাদিন সে কিছুই খেতে পারেনি। যা খাচ্ছে বমি করে দিচ্ছে।’ 


মহারাজ চিন্তাযুক্ত কণ্ঠে বললেন, ‘কেন? হঠাৎ এরকম হচ্ছে কেন?’ 


-’বুঝতে পারছি না। আমার মনটা নানা রকম আশঙ্কায় শংকিত হয়ে আছে। মনে হচ্ছে যেন একটা কালঝড় তেড়ে আসছে।’ 


-’এতো চিন্তার কিছু নেই। তুই মনে সাহস রাখ।’  


কথাটা বলে শেষ করে মহারাজ হাত ঘড়িটা একবার দেখে নিলেন। 


-’এখন উঠিরে। দরবারে যেতে হবে। তুর্যয়ের জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হচ্ছে। এই কমিটি তাকে শাসন কার্য সংক্রান্ত নানা বিষয়ে জ্ঞান দান করবে। মৃত্যুর আগে আমি তাকে একজন যোগ্য শাসক হিসেবে দেখে যেতে চাই।’ 


-’আমার বিশ্বাস তুর্যয় তার পিতার নাম রক্ষা করবে।’ 


মহারাজ বিদায় নেবার সময় মহারানি অনুনয়ের কণ্ঠে আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিলেন, ‘আপনি কিন্তু আজ আমার এখানেই ফিরছেন। আমি অপেক্ষা করব।’ 


মহারাজ মৃদু হেসে সম্মতি জানালেন। আজ দুদিন ধরে উপপত্নী রম্ভার কথা খুব মনে পড়ছে। সেই ঘরে মহারাজের একটি কন্যা সন্তান আছে। কন্যাটিকেও একবার চোখের দেখা দেখার জন্য বড়ই মন আকুপাকু করছে। জারজ সন্তান বলে সেই মেয়ে রাজকন্যা উপাধি পায়নি। রাজরাজড়াদের বাৎসল্যর মতো দুর্বলতা মানায় না। তথাপি মহারাজের মনটা সকল পুত্র কন্যার জন্যই আবেগ মথিত হয়। উর্মিলাকে মন থেকে ভালোবাসেন বলেই দ্বিতীয় বিবাহ করেননি। তাঁর জীবনে একাধিক রমণীর আনাগোনা থাকলেও ঊর্মিলার স্থানটি যে পাকাপোক্ত এবং অনন্য সেই সত্যের প্রমাণ তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিটি কাজের মাধ্যমে রেখে যেতে চান। 

'#oran_megher_deshe' '#উড়ান_মেঘের_দেশে'
'#bangla_story_143' '#banglastory143'

-----------------------------------------


সমুদ্রকুঞ্জের লাইট হাউজের ঘড়িতে যখন ঢংঢং শব্দে রাত দশটার ঘন্টা বাজল, মেহেরুর শেভরলে গাড়িটা ঠিক সেই মূহুর্তে জলমহল সংলগ্ন গাড়িবারান্দায় এসে দাঁড়ালো। কৃত্রিম হ্রদের মাঝে দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে থাকা মহলটির সর্বাঙ্গে ঝলমল করছে নানা রঙের মরিচ বাতি। আলো প্রতিফলিত হচ্ছে হ্রদের টলটলে স্বচ্ছ জলে। তাকালে কেমন একটা মায়ার মতো বিভ্রম সৃষ্টি হয়। মনে হয় জায়গাটা বুঝি মর্ত্যলোকের কোনও অংশ নয়। এই জায়গা স্বর্গস্থ। মহলের ভেতর থেকে প্রতিধ্বনির মতো ঝুমুর ঝুমুর নূপুরের আওয়াজ ভেসে আসছে। সেই সাথে গানের সুর। মেহেরু ভেতরে ভেতরে বেশ অস্থির বোধ করছিল। মহারাজের সাথে তার জীবনে শুধু একবার কথা হয়েছিল। তাও অতি অল্প সময়ের জন্য। মহারাজের সেই সাক্ষাত স্মরণে থাকার প্রশ্নই ওঠে না। 


আজ থেকে প্রায় নয় বছর আগে, হঠাৎ একদিন জলমহলের গানের আসরে মেহেরুর ডাক পড়েছিল। তার গানের গলা অতুলনীয়। স্কুল কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সে বেশ কয়েকবার সংগীত পরিবেশন করেছে। এমনকি জাতীয় পর্যায়েও পুরস্কার জিতে নিয়েছে গান গেয়ে। মেহেরুর বাবা ছিলেন রাজকুমার রাজকন্যাদের ব্যক্তিগত পাঠশালার শিক্ষক। পিতার মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরার নিমিত্তে এই পাঠশালার দায়িত্ব মেহেরুকেই গ্রহণ করতে হল। 


সেই দুপুরটা স্মৃতিতে এখনো জলজ্যান্ত। রাজকন্যা মাথাব্যথার অজুহাতে পাঠশালায় আসেনি। মেজো কুমারও কী এক কারণ বশত অনুপস্থিত। উপস্থিত আছে শুধু বড় এবং ছোট কুমার। ছোট কুমার বিজয়কে স্কুলের হোম ওয়ার্ক করাচ্ছিল মেহেরু। খানিক দূরের একটি বেঞ্চিতে বড় কুমার তুর্যয় বসে আছে। ক্লাস টেন পর্যন্ত তুর্যয়কে মেহেরুই পড়াত। কলেজে ওঠার পর তুর্যয়ের জন্য আলাদা মাস্টার রাখা হয়েছে। তবে প্রায়শই সে পড়াশোনার বিষয়ে মেহেরুর সাহায্য নিয়ে থাকে। আজকে পদার্থ বিজ্ঞানের একটি সূত্র নিয়ে আলাপ করতে এসেছিল। ওটাই ছিল বড় কুমারের সাথে মেহেরুর শেষ সাক্ষাৎ। এর পরদিন এমন একটা কাণ্ড ঘটেছিল …… ওসব কথা এখন থাক। 


সেদিন ছিল শ্রাবণ মাসের দ্বিতীয় দিন। বাতায়নের বাইরে দূর দুরান্ত অবধি প্রসারিত হয়ে আছে উড়ান মেঘের দল। হাওয়ায় ভেজা বৃষ্টির ঘ্রাণ। বিজয় অংক কষছে মনোযোগ দিয়ে। খানিক দূরে তুর্যয় বসে আছে। একটা সাদা কাগজে কিছু একটা আঁকিবুঁকি করছে। মেহেরু পাঠশালার কক্ষ থেকে বেরিয়ে অলিন্দে এসে দাঁড়ালো। একটি গানের সুর গুনগুন করছিল সে আপনমনে। হঠাৎ পেছন থেকে একটা ভরাট কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। চমকে পেছন ফিরে তাকায় মেহেরু। স্বয়ং মহারাজ দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে ঘরোয়া বসন। একটি ধূসর আলোয়ান কাঁধের ওপর ছড়ানো। পায়ে দুই ফিতার চপ্পল। মেহেরু স্থম্ভিত। মহারাজ বলা কওয়া ছাড়া আচমকা পাঠশালায় এসে হাজির হবেন এ এক অভাবনীয় ঘটনা। একটা বিভীষণ ভয় মেহেরুর বুকের মধ্যে অশ্বখুরের মতো দাপাদাপি করতে লাগল। পাঠদান রহিত করে সে বাইরে দাঁড়িয়ে মনের সুখে গান গাইছে এই অপরাধে মহারাজ যদি তাকে চাকরীচ্যুত করে তো কী উপায় হবে? মা বোনকে নিয়ে সে খেয়ে পড়ে বাঁচবে কী করে? ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কুর্নিশ করে বলল, ‘মহারাজ অপরাধ মার্জনা করবেন।’ 


মহারাজের মুখে একটি প্রসন্ন হাসি। তিনি অত্যন্ত নরম গলায় বললেন, ‘তুই কে রে?’ 

মেহেরু নিজের পিতার নাম বলতেই মহারাজ চিনে ফেললেন। প্রসন্ন কণ্ঠে বললেন, ‘গানটা তো ভারী সুন্দর গাইছিলি! আরেকবার গেয়ে শোনা তো দেখি!’ 


কুণ্ঠিত, বিপন্ন এবং বিব্রত মেহেরু উপায়ান্তর না পেয়ে গান গাওয়া শুরু করল। মহারাজের আদেশ অমান্য করার সাধ্য তার নেই। বয়স অল্প হলেও পুরুষ মানুষের নজর সে পড়তে পারে। মহারাজের অভিজ্ঞ দুটি চোখ তার একুশ বছরের তন্বী দেহের ওপর টর্চ লাইটের মতো প্রতিফলিত হচ্ছিল। রাজার বয়স তার পিতার বয়সের আশেপাশেই হবে। হলে কী হবে? রাজ রাজড়াদের কোন বয়সের সীমাবদ্ধতা থাকে না। তাঁদের জন্য রাজ্যের প্রতিটি নারীই উপভোগ্য এবং সহজলভ্য। মেহেরু ভেতরে ভেতরে ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিল। কম্পমান কণ্ঠ নিয়েই তাকে গান গাইতে হচ্ছে। মহারাজের চোখে মুখে মুগ্ধতার রেশ। গান শেষ হলে আবেশ ছাওয়া কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘তোর গানের গলা তো অপূর্ব! তুই জলমহলের সংগীত সভায় আসবি। আমন্ত্রণ রইল।’ সেই মুহূর্তে তুর্যয় পিতার পশ্চাৎপটে এসে দাঁড়িয়েছে। মহারাজের দৃষ্টি পুত্রের দিকে ধাবিত হতেই মেহেরু কুর্নিশ করে জায়গাটা থেকে অতিদ্রুত নিষ্ক্রান্ত হলো। 

'#oran_megher_deshe' '#উড়ান_মেঘের_দেশে'
'#bangla_story_143' '#banglastory143'

পরদিন সন্ধ্যায় মেহেরুদের শহরতলীর ভাঙ্গাচোরা বাড়ির সামনে প্রাসাদের সুসজ্জিত বাহন এসে দাঁড়ালো। স্বয়ং মহারাজ তার গান শুনতে চেয়েছেন। এই আমন্ত্রণ পায়ে ঠেলে দেয়ার কোনও সাহস তার নেই। অগত্যা মেহেরুকে সাজগোজ করে পুরোদস্তুর তৈরি হয়ে জলমহলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে হয়েছিল। কিন্তু পথিমধ্যে গাড়ির চালকের মোবাইলে একটি ফোন এলো। ওপাশ থেকে কে কী বলল কে জানে, চালকটি ফোন রেখে মেহেরুকে জানালো, আপনার যেতে হবে না। প্ল্যান ক্যান্সেল হয়েছে।মেহেরু হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। কী কারণে মহারাজ সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছিলেন তা সে আজও জানে না। জানার চেষ্টাও করেনি। মানসিক ভাবে সে ছিল বিপর্যস্ত। সেদিনই দুপুরবেলা ঘটে গিয়েছিল এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। যে ঘটনার পর মেহেরু মনে মনে শ্বপথ নিয়েছিল, রাজবাড়িতে আর কোনওদিন পদচারণ করবে না। কিন্তু গরীবের কথার যেমন দাম নেই, ঠিক তেমনি শ্বপথেরও স্থায়িত্ব নেই। 


সেই থেকে আজ অবধি, আর কখনো জলমহলে মেহেরুর ডাক পড়েনি। আজ জলমহলের সামনে মহারাজের ব্যক্তিগত সচিব রায় মশাইয়ের গাড়ি দেখা যাচ্ছে। রায় মশাইয়ের উপস্থিতিতে মহারাজের সাথে সাক্ষাত করা সমীচীন হবে না। রানিমার কানে খবর চলে যাবার সম্ভাবনা আছে। 


জন্মগত ভাবে যে তিনটি জাদুশক্তির অধিকারী হয়েছে সে তার মধ্যে একটি হলো সম্মোহনবিদ্যা। এই সম্মোহন জাদু চালনার জন্য তার চাই নির্জন কক্ষ। তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতিতে এই জাদু কাজ করবে না। কিন্তু ঘরভর্তি জলসার মধ্যে মহারাজকে একান্তে পাওয়া কি সম্ভব হবে? তার ব্যাগে একটি স্ট্যাম্প সমেত ঘোষণাপত্র আছে। সেই ঘোষণাপত্রে ছাপার অক্ষরে লেখা আছে, বিশেষ বিবেচনায় আস্তাবলের কর্মচারী ইশানের শাস্তি মওকুফ করা হলো। এই পত্রে যে কোনও উপায়ে একবার মহারাজের সই নিতে পারলেই সমস্যার নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। ভোর হওয়ার আগে মেহেরুকে শাস্তি মওকুফের ঘোষণাপত্র নিয়ে রাজপুরীর বন্দিশালায় উপস্থিত হতে হবে। এই মুহূর্তে সে জলমহল থেকে নিরাপদ দুরত্বে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখে অপেক্ষা করছে। সচিব মশাই বেরিয়ে এলেই সে মহলে প্রবেশ করবে। রাত বাড়তে থাকুক, সমস্যা নেই। তার জানা মতে এই জলসা ভোর অবধি চলবে। মহারাজের সুরার নেশা যত গভীর হবে মেহেরুর কাজ ততই সহজ হবে। 

'#oran_megher_deshe' '#উড়ান_মেঘের_দেশে'
'#bangla_story_143' '#banglastory143'

এদিকে মহারানি উর্মিলার কক্ষে রাজার জন্য শয্যা সজ্জিত করা হচ্ছে। পালঙ্কে দেয়া হয়েছে নতুন চাদর, জানালায় নতুন পর্দা। ঘরময় আগর বাতির সুগন্ধি। রানিমা সময় নিয়ে স্নান করেছেন। তাঁর পরনের বসন খানিও নতুন। মুখে প্রসাধনীর আধিক্য নজর কাড়ার মতো । বাহুতে স্বর্ণের বাজু। গলায় মহারাজের নিজের পছন্দে বিলেত থেকে কিনে আনা হীরের লকেট। তাঁর বয়স সাতচল্লিশ। শরীরের গাঁথুনি আজো চমৎকার। মুখে বয়সের ছাপ পড়েনি। দূর থেকে দেখলে এই বয়সেও তাকে যুবতী বলে ভ্রম হয়। সুসজ্জিত কক্ষে পরিপাটি হয়ে তিনি অপেক্ষা করছেন স্বামীর পথ চেয়ে। তাঁর মনটা আজ অন্যরকম প্রশান্তিতে ছেয়ে আছে। মহারাজ আজ রাতে কোনো রক্ষিতার শরণাপন্ন হবেন না। জলমহল থেকে সোজা তাঁর কাছেই উপস্থিত হবেন, রাত্রি যাপনের উদ্দেশ্যে। এই ঘটনায় মহারানির মনে ক্রমশ এক বিজয়ের আনন্দ ঘনিয়ে আসছে।  


---------------

No comments

Powered by Blogger.