গল্প | উড়ান মেঘের দেশে - পর্ব-০৩ | Oran megher deshe - Part-03

লেখিকা | ওয়াসিকা নুযহাত


মহারানির নিজস্ব কক্ষে বাইরের লোকের প্রবেশ নিষেধ। গোপনীয়তা রক্ষার নিমিত্তে গণক মশাইকে গ্রন্থাগারের অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি কোণে বসানো হয়েছে। বাষট্টি বছর বয়সী গণকের মাথা ভর্তি আউল বাউল সাদা চুল। তার নাম বল্লভ সেন। পরনে একটি ছাই রঙের কুঁচকানো পাঞ্জাবি। ঠোঁটের ওপর পুরু গোঁফ। গ্রন্থাগারে এই মুহূর্তে কোনও বৈদ্যুতিক আলো জ্বলছে না। সুবিশাল লম্বাকৃতির কক্ষটির চতুর্দিকে ছড়ানো ছিটানো আছে একাধিক গবাক্ষ। সেসব গবাক্ষ দিয়ে সূর্যের পর্যাপ্ত আলো ঘরে প্রবেশ করেছে। কিন্তু সিলিং ছোঁয়া উঁচু উঁচু বইয়ের তাক আলো বিকিরণে বাধা সৃষ্টি করছে। দুটি সুউচ্চ তাকের মধ্যবর্তী স্থানে গণক মশাই বসেছে আসন পেতে। তার মুখোমুখি বড়সড় একটি আলখাল্লা পরিহিত অবস্থায় ঘোমটা টেনে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং মহারানি ঊর্মিলা । নিজ কক্ষ থেকে গ্রন্থাগার পর্যন্ত তিনি কোন ভৃত্য বা দেহরক্ষী ছাড়াই এসেছেন। গণকের সাথে এই সাক্ষাত তিনি একান্ত ব্যক্তিগত সীমারেখার মধ্যেই আবদ্ধ রাখতে চান। 


গণকের চক্ষু মুদিত। মুখের বলিরেখার ভাঁজে ভাঁজে গভীর ব্যগ্রতার প্রতিফলন। 


উর্মিলা বেশ অধৈর্য হয়ে আছেন আগে থেকেই। অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘হলো আপনার? কী দেখতে পেলেন?’ 


বল্লভ সেনের চোখদুটো হালকা কম্পিত হলো। কিন্তু প্রসারিত হলো না। অর্ধনিমীলিত চোখে চেয়ে গম্ভীর গলায় সে প্রথমে শুধু একটি শব্দ উচ্চারণ করল, ‘মৃত্যু!’ 


মহারানি চমকে উঠলেন,’কী বলছেন? কার মৃত্যু? মহারাজকে কি তবে সত্যিই আর বাঁচানো যাবে না?’ 


-’মহারাজের মৃত্যু অবধারিত। কিন্তু শুধু এটাই নয়। এই মুহূর্তে আমার দিব্যদৃষ্টি বলছে রাজ্যর বহু নিষ্পাপ মানুষ মারা যাবে। দুর্যোগ সমাসন্ন!’ 


‘সর্বনাশ! কীসের দুর্যোগ?’ 


-’সেটা ঠিক স্পষ্ট নয়।’ 


-’আর কী দেখছেন?’ 


-’রাজপুত্রদের মধ্যে একজনের প্রাণহানির আশঙ্কা আছে।’ 

#উড়ান_মেঘের_দেশে, #oran_megher_deshe
#ওয়াসিক_নুযহাত, #wasika_nuzhat_faria

ঊর্মিলার কণ্ঠ ঠেলে এক বক্ষচেরা আর্তনাদ বেরিয়ে এলো, 


 -'এ আপনি কী বলছেন?’ 


-’কালোজাদু! কালজাদু ঘুরছে রাজ্যের আকাশে বাতাসে।’  


-’কিন্তু জাদুকরদের কেউ তো জীবিত থাকার কথা না। তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে বহু আগে।’  


-’কেউ কেউ লুকিয়ে আছে আনাচে কানাচে।’ 


-’আপনি কোন কুমারের মৃত্যু দেখতে পাচ্ছেন?’ 


-’বড় অথবা মেজো । যে কোন একজন ।’ 


-’এর প্রতিকার বলুন।’ 


-’এই মুহূর্তে প্রতিকার বলতে পারছি না। আমার কিছু সময় প্রয়োজন।’ 


-’শত্রুর উদ্দেশ্য কী?’ 


-’প্রতিশোধ, ক্ষমতা দখল এবং রাজবংশের পতন।’ 


-’এই রাজ্যে কালোজাদু নিষিদ্ধ। যদি কোন জাদুকর সাধারণ মানুষের ভিড়ে লুকিয়ে থাকে তো তাকে আবিষ্কার করা মাত্রই হত্যা করা হবে। মহারাজের এরকমই হুকুম আছে।’


এই কথায় বল্লভ সেন নিশ্চুপ হয়ে রইল। 


-’আপনি এই জাদু কাটানোর ব্যবস্থা করুণ গণক মশাই। বিনিময়ে যা চাইবেন তাই দেয়া হবে।’ 


-’আমাকে একটু সময় দিন। অতি শীঘ্রই একটা ব্যবস্থা হবে।’ 

#উড়ান_মেঘের_দেশে, #oran_megher_deshe
#ওয়াসিক_নুযহাত, #wasika_nuzhat_faria

---------------------------


মহারাজ বীরবল শায়িত আছেন শয়ন কক্ষের সুসজ্জিত শয্যায়। পাশেই একটি আরামকেদারায় কন্যা নীহারিকা বসে আছে অবনত বদনে। এই কন্যাটি মহারাজের চোখের মণি। কন্যার পবিত্র মুখের দিকে তাকালে তাঁর পাথরসম শক্ত হৃদয়ও মোমের মতো গলতে শুরু করে। তাঁর আরো দুটি কন্যা আছে উপপত্নীদের সংসারে। সেই কন্যাদুটির প্রতি এত মায়া নেই যতটা নীহারের জন্য আছে। এই অপ্রতিরোধ্য দুর্বলতার পেছনে পাটরানি ঊর্মিলার ভূমিকা অনস্বীকার্য। মহারাজ বাস্তবিকই ঊর্মিলাকে ভালোবাসেন। আর ভালোবাসেন বলেই জীবনে একাধিক নারীর আগমন ঘটলেও রানির মর্যাদা একমাত্র ঊর্মিলা ব্যতীত অন্য কারো ভাগ্যে জোটেনি। মৃত্যুর আগে তিন কন্যার বিবাহ দেবার ব্যবস্থা করে যাবেন বলে মনস্থির করেছেন মহারাজ। ডাক্তার বলেছেন হাতে বড়জোর নয় থেকে দশ মাস সময় আছে। এই সীমিত সময়ের মধ্যে কিছু গুরুকার্য সমাধা করতে হবে। কন্যাদের বিবাহের সুব্যবস্থা, বড় রাজপুত্রর হাতে রাজ্যের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া, শিখিয়ে পড়িয়ে দেয়া ইত্যাদি। বড় কুমার তুর্যয়ের মেধা উন্নত। কিন্তু রাজ্যের শাসন ভার কাঁধে তুলে নেবার মতো দুঃসাহসিক মনোবলের অধিকারী সে এখনও হয়ে ওঠেনি। তার ভেতর এখনও ছেলেমানুষি আবেগ অনুভূতির প্রাবল্য আছে। রাজাদের আবেগি হলে চলে না। চারদিকে শত্রুরা প্রেতাত্মার মতো ফোঁসফোঁস নিশ্বাস ফেলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই সীমাহীন প্রতিকূলতার ভেতর মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার মতো সুকৌশলী দক্ষতাপূর্ণ শাসক তুর্যয় ঠিক কবে হয়ে উঠতে পারবে, আদৌ কখনও হতে পারবে কিনা এই নিয়ে মহারাজের মনের মধ্যে সংশয় আছে। 


নীহার ব্যতীত কক্ষের অভ্যন্তরে এই মুহূর্তে দ্বিতীয় কেউ উপস্থিত নেই। রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী জাফর বাইরে অপেক্ষা করছে। রাজকন্যার প্রস্থান মাত্রই সে ভেতরে ঢুকবে। মহারাজ দেখলেন কন্যার চোখ অশ্রুসজল। তিনি কন্যাকে কাছে টেনে নিলেন । অতি নরম গলায় বললেন, ‘আমার পক্ষী রানির মন খারাপ কেন?’ 


-’বাবা, আপনার জন্য আমার জন্য মন কেমন করছে। আপনি আমাদেরকে ছেড়ে কোথাও যেয়েন না দয়া করে।’ 


মহারাজ স্মিত হাসলেন, ‘প্রতিটা মানুষ পৃথিবীতে একটি সুনির্দিষ্ট সময় কালের জন্য আসে।সময় শেষ হলে তাকে পূর্বের জায়গায় ফিরে যেতে হয়।’ 


-’আপনার সময় এখনও শেষ হয়নি। এতো তাড়াতাড়ি কী করে শেষ হয়?’ 

#উড়ান_মেঘের_দেশে, #oran_megher_deshe
#ওয়াসিক_নুযহাত, #wasika_nuzhat_faria

-’সময়ের ওপর তো মানুষের হাত নেই।’ কথা বলতে বলতে মহারাজ নীহারের সাজপোশাকের দিকে লক্ষ্য করলেন। তার পরনে লম্বা হাতা সাদা শার্ট। কালো প্যান্ট এবং হাঁটু পর্যন্ত ওঠা বুট জুতো। 


-’তুমি কি কোথাও বেড়াতে যাচ্ছ পক্ষী রানি?’ 


নীহার চোখ মুছে বলল, ‘বাবা, আমার ঘোড়া চালানো শেখার শখ হয়েছে। আস্তাবলের সবচেয়ে সুন্দর ঘোড়াটা আমার চাই।’  


মহারাজ সহাস্যে বললেন, ‘তুমি কোন চিন্তা করো না। ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’   


নীহার পিতার হাতে একটি চুম্বন করে কুর্নিশ জানিয়ে কক্ষ থেকে বিদায় নিল। প্রধানমন্ত্রী জাফর প্রবেশ করল ক্ষণকালের মধ্যেই। জাফরের সাথে মহারাজের বন্ধুসুলভ একটি সুসম্পর্ক আছে। প্রশাসন সম্পর্কিত কাজের বাইরেও তিনি জাফরের সাথে ব্যক্তিগত নানা বিষয় নিয়ে আলাপ করে তৃপ্ত বোধ করেন। জাফরকে দেখে একটু খুশিই হলেন বোধহয়। ম্লান মুখে হালকা একটা হাসির রেখা উদয় হল। 


-’কী খবর?’ 


জাফর কুর্নিশ করে খাটের পাশে রাখা আসনে বসল, ‘বড় কুমার আগামীকাল বিকেলের মধ্যেই রাজ্যে উপস্থিত হবে। রাজধানীতে তাঁকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। বিকেল বেলায় ঘণ্টা খানেক সময় নগরের রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ থাকবে। পায়ে হেঁটে লোকজন চলাফেরা করতে পারবে, তবে বাহন সমেত নয়। স্কুল কলেজ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। অফিস আদালত চলবে যথা নিয়মে, শুধু বিকেল পাঁচটা থেকে ছটা পর্যন্ত রাস্তায় কোনও গাড়ি নামবে না। রাত আটটায় সমুদ্রের তীরে ফায়ার ওয়ার্কসের আয়োজন করা হয়েছে। প্রাসাদের দখিন মুখী প্রতিটি বারন্দা বা জানালা থেকে এই ফায়ার ওয়ার্কস দেখা যাবে।’  


-’বেশ!’ 


-’মহারাজ, আপনি কি বড় কুমারকে অতি শীঘ্রই যুবরাজ ঘোষণা করতে যাচ্ছেন?’ 


-’আমার হাতে আর সময় কোথায়?’ 

#উড়ান_মেঘের_দেশে, #oran_megher_deshe
#ওয়াসিক_নুযহাত, #wasika_nuzhat_faria

জাফর খুকখুক করে একটু কেশে নিয়ে বলল, ‘অভয় দিলে একটি কথা বলব।’ 


-’বলে ফেলো।’ 


-’বড় কুমার বহুদিন দেশের বাইরে ছিলেন। যতটা জানি দেশে ফিরে আসার খুব একটা তাগিদও তাঁর মধ্যে ছিল না। নেহাত আপনি আদেশ করেছেন বলেই তিনি দেশে ফিরছেন। অন্তরে দেশপ্রেম না থাকলে কি দেশের শাসক হওয়া যায়? আমার মনে হয় আপনি বড় কুমারের পরিবর্তে মেজো কুমারকে যুবরাজ ঘোষণা করুন। মেজো কুমার জন্ম থেকে এই পর্যন্ত রাজ্যের অভ্যন্তরেই বেড়ে উঠেছে। দেশ ছেড়ে কোথাও কখনও যায়নি। দেশের প্রতি তাঁর টান অন্যরকম মজবুত।’


-’বড় জনের উপস্থিতিতে মেজো জনের মাথায় মুকুট উঠলে জনগণ এটা মেনে নেবে বলে মনে করো? মিডিয়া কড়া সমালোচনা করবে। তুর্যয়ই সিংহাসনের উত্তরাধিকার। এই প্রাপ্তি থেকে আমি তাকে বঞ্ছিত করতে পারি না। অজয়কে এখনও আমার ছেলেমানুষ মনে হয়। ওর মধ্যে একটা বাউন্ডুলে ভাব আছে। এই ছন্নছাড়া ছেলেটার ওপর কিছুতেই নির্ভর করতে পারি না।’ 


-’শহরের যুব সমাজের ওপর অজয়ের বেশ ভালো প্রভাব আছে। অনেকেই তাকে পছন্দ করে। এর মধ্যেই তার সমর্থকরা দাবি তুলেছে তাকেই যেন ক্রাউন প্রিন্স ঘোষণা করা হয়।’ 


মহারাজ ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘কিন্তু এই দাবি তো অনৈতিক। রাজার জ্যেষ্ঠ পুত্র ক্রাউন প্রিন্স হবে এটাই তো নিয়ম।’ 


-’বড় পুত্র দেশে উপস্থিত থাকলে এমন দাবি নিশ্চয়ই উঠত না।’ 


-’দেশে উপস্থিত থাকা না থাকার ওপর কিছু নির্ভর করে না জাফর! আমি এই নীতিবিরুদ্ধ কাজ কিছুতেই করতে পারব না। শুধু সমুদ্রকুঞ্জ নয়, পুরো পৃথিবী তুর্যয়কেই ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে দেখতে চায়। গতকাল এই বিষয়ে বিবিসিতে একটি খবর প্রচার করা হয়েছে। তারা ধারণা করছে কিছুদিনের মধ্যেই তুর্যয়ের মাথায় মুকুট উঠবে।’ 


-’সে আপনার বিবেচনা মহারাজ। বড় কুমার আগ্রহ নিয়ে সিংহাসনে আসীন হতে চাইলে তো আর কোন ঝামেলাই রইল না। আরেকটা কথা ..... একজন পাগলী মহিলা হইচই করে রাজ্য মাথায় তুলেছে। আপনি কি এই ব্যাপারে কিছু শুনেছেন মহারাজ?’ 


রাজা গম্ভীর মুখে বললেন, ‘পাগলের কথা অত পাত্তা দেয়ার কী আছে?’ 


-’মহারাজ, পাগলটা বারবার কী একটা অভিশাপের কথা বলছে। মিডিয়ায় গুজব উঠেছে এই পাগলি রাজবংশের কোনও গোপন ইতিহাস জানে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাগলির ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে। সেসব ভিডিও এর মাঝেই ভাইরাল।’    

#উড়ান_মেঘের_দেশে, #oran_megher_deshe
#ওয়াসিক_নুযহাত, #wasika_nuzhat_faria

-’এই পাগল থাকে কোথায়?’ 


-’জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত এতদিন। লোকে তাকে ডাইনি বলে। কেউ কেউ আবার দাবি করে এই ডাইনি জাদু জানে।’ 


মহারাজের ক্লান্ত মুখখানা হঠাৎ করেই শ্রাবণের মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মতো থমথম করে উঠল, 


-’নাম কী?’ 


-’নাম কেউ জানে না।’ 


মহারাজ একটু সময় চুপ থেকে বললেন, ‘হত্যা করা হোক তাকে। সমুদ্রকুঞ্জ থেকে জাদুকরদের বিতাড়িত করা হয়েছে বহু আগে। এই রাজ্যে জাদুকরের ঠাই নেই।’ 


জাফর সাবধানী গলায় বলল, ‘ইয়ে … মহারাজ … বলছিলাম কী, জাদুর ব্যাপারটার কোনও প্রমাণ নেই। আজকাল ওসব কেউ বিশ্বাসও করে না। বিনা অপরাধে একজন বিকৃত মস্তিষ্কের মহিলাকে হত্যা করলে জল আরও বেশি ঘোলা হবে না? জনতার এর মাঝেই পাগলির ওপর একটা সফট কর্নার হয়ে গেছে।’ 


মহারাজ এবার বেশ বিরক্ত হলেন -’জনতা কী ভাবল তাতে কিছু এসে যায় না। এই দেশে গণতন্ত্র চলে না। রাজতন্ত্র চলে। মহিলাকে খতম করে আত্মহত্যা বা অপঘাতে মৃত্যু বলে চালিয়ে দিলেই হলো। সবকিছু যদি আমাকেই বলে দিতে হয় তাহলে তোমরা করবেটা কী?’ 


জাফর তটস্থ হয়ে উঠল, ‘জি মহারাজ। একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। হার্ট অ্যাটাকের ফলস মেডিকেল রিপোর্ট বানাতে বলে দেব।’    


-’যা করার আজকের মধ্যেই করো।’ 


-’জো হুকুম।’ 


মহারাজ কুঞ্চিত ভ্রুদ্বয় নিয়ে অন্যদিকে মুখ সরিয়ে নিলেন। এর মানে অলোচনায় তিনি ইতি টানতে চাইছেন। মন্ত্রী মশাই বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ করল। মহারাজের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী প্রণব কক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। মন্ত্রীর প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গেই সে কক্ষে প্রবেশ করল। মহারাজ তাকে দেখামাত্র বলে উঠলেন, ‘জলমহলে যাব। ব্যবস্থা করো। নাচ গানের লোকদের খবর দাও। আজ সারারাত বাদ্য বাজনা হবে।’ 


----------------------------- 


বিকেলের আকাশে সূর্যদেবের দাপট কিঞ্চিৎ নিষ্প্রভ হতেই দুই সখী দলবল নিয়ে প্রাসাদের নিচে এসে হাজির হলো। আজ বসন্তের প্রথম দিন। বায়ু নির্মল এবং মসৃণ। প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচায় নানা বর্ণের চোখ ধাঁধানো ফুলের সমাহার। গাছে গাছে কোকিল ডাকছে কুহু কলতানে। চমৎকার একটি মন মাতানো দিন। প্রাসাদের বারান্দার সিঁড়ির ধাপে পাঁচ ছয়জন মেয়ের একটা দল দাঁড়িয়ে আছে। মনিকা এবং নীহার বাদে বাকিদের পরনে ইউনিফর্ম। এরা প্রাসাদের কর্মচারী। উঁচু গম্বুজের ওপর একটি লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া পাখি বসে আছে। এই পাখিটিকে বহুদিন ধরে প্রাসাদ সংলগ্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। কথিত আছে কেউ মিথ্যে কথা বললে পাখিটি হিহি করে হেসে ওঠে। আর সত্য কথার প্রেক্ষিতে জোর গলায় বলে ওঠে, ‘ঠিক ঠিক ঠিক!’ 


#উড়ান_মেঘের_দেশে, #oran_megher_deshe
#ওয়াসিক_নুযহাত, #wasika_nuzhat_faria


সম্মুখের চত্বরে একটি ধবধবে সাদা রঙের সুসজ্জিত ঘোড়া রাজকন্যার জন্য অপেক্ষা করছে। ঘোড়ার ঠিক পাশে যে তরুণটি দাঁড়িয়ে আছে তার নাম ইশান। বয়স একুশ। ছিপছিপে লম্বা। দেহবর্ণ উগ্র তামাটে। চোখ দুটি ঈষৎ টানা। মাথা ভর্তি কোঁকড়ানো চুল। পরনে একটি ঘিয়া রঙের হাতাকাটা জামা এবং পাজামা। কোমরে বাঁধা লাল গামছা। ধূলো ধুসরিত নগ্ন দুটি পা। মাথা নত করে দাঁড়ানোর ভঙ্গী অনুগত।   


রাজকন্যা নীহার মণিকার কানে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘এই গেঁয়ো ভূতটাকে তোর পছন্দ?’ 


মণিকা হাসে, ‘খুব!’ 


-’তোর রুচি জঘন্য।’ 


-’বেশ তো, ঘোড়া আর ঘোড়সওয়ার, দুটোই তবে আমাকে দিয়ে দে।’  


-’উঁহু, ঘোড়াটা আমার চাই। রাজা মশাই উপহার দিয়েছেন। তোকে অন্য ঘোড়া দেয়া হবে। তুই নিজে পছন্দ করে নিস।’ 


ইশান ভেতরে ভেতরে অপ্রস্তুত বোধ করছিল। রাজকন্যাকে সে কোনদিন স্বচক্ষে দেখেনি। রাজ্যের কোনও মানুষই দেখেনি কখনও। শুনেছে রাজকন্যার রুপের আধিক্যের কারণেই এই গোপনীয়তা। মণিকা নামের একটি মেয়ে, যে কিনা নিজেকে রাজকন্যার সখী বলে দাবি করে, সেই মেয়েটির কারণেই রাজকন্যাকে ঘোড়া চালানো শেখানোর দায়িত্বটা তার কাঁধে এসে পড়ল। ওই মেয়েটি একটা বিচ্ছু। একদিন হুট করে আস্তাবলে এসে হাজির। ইশান কাজের ফাঁকে ফাঁকে পড়াশোনা করে। তার সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক আছে। দরিদ্র কৃষক বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে উচ্চ শিক্ষিত হবে। সমুদ্রকুঞ্জে উচ্চশিক্ষার খরচ অনেক। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতেও অত্যধিক ভালো ফলাফল না থাকলে বিনা পয়সায় পড়ার সুযোগ নেই। ইশান মাঝারি গোছের ছাত্র। বৃত্তি জোটেনি ভাগ্যে। ঠিক করেছিল বাংলাদেশে চলে যাবে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগও হয়েছিল পড়ার। কিন্তু বাবার অসুস্থতা ব্যাঘাত ঘটাল। মা মারা গেছে বহু আগে। সংসারে আছে অসুস্থ পিতা এবং একমাত্র ছোট ভাই। এমতাবস্থায় পিতা এবং ছোটভাইকে ফেলে রেখে দূরে অবস্থান করাটা কোন ভাবেই সম্ভব হল না তার পক্ষে। স্নাতক ডিগ্রি না থাকায় উচ্চ পদস্থ চাকরি জুটল না। ব্যবসা করার মূলধন নেই। উপায় না পেয়ে বাবার কৃষিকাজ দেখভাল করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিল। তাতেও লাভ কিছুই হলো না। বাবার চিকিৎসা আর ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ জোটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হলো। উপায়ান্তর না পেয়ে বন্ধুর পরামর্শে রাজবাড়ির কর্মচারি পদে নিয়োগের জন্য দরখাস্ত করল। দরখাস্ত মঞ্জুর হল তবে ভদ্রস্থ পদ পাওয়া গেলো না। হতে হল আস্তাবলের ঘোড়সওয়ার। তবুও রাজকোষ থেকে যে মাসোহারা ধার্য করা হয়েছে তা কৃষিবৃত্তির আয়ের চেয়ে উন্নত। মণিকা যেদিন আস্তাবলে হানা দিল ইশানের কোলে সেদিন রবি ঠাকুরের সঞ্চয়িতা। খড়ের গাদার ওপর বসে, হাতে বই নিয়ে বিড়বিড় করে একটি কবিতা আবৃত্তি করছিল সে। ঘোড়া গুলো সারি বাঁধা ঘরের খুপরি থেকে থেকে মাথা বের করে রেখেছে। একজন চপলমতি তরুণী ঘোড়া দর্শন করছে। ঘোড়ার মাথায় হাত রেখে নিজের মনে কথা বলছে। হঠাৎ তরুণীর চোখ পড়ল ইশানের দিকে। 


-’তুমি কাজ ফেলে রেখে আরাম আয়েশ করছ কেন?’ 


ইশান একটু ত্যাড়া গলায় বলল, ‘তাতে তোমার কী?’ 


-’তুমি জানো আমি কে?’ 


-’জানার কোনও ইচ্ছে নেই। তুমি আস্তাবলে এসেছ কেন? মেয়েরা এখানে আসে না।’ 


-’কেন? মেয়েরা এলে ক্ষতি কী?’ 


-’লাভ ক্ষতি জানি না। শুধু জানি মেয়েদের এখানে আসা নিষেধ। তুমি ফিরে যাও।’ 


মেয়েটির মধ্যে ফিরে যাবার কোনও লক্ষণ দেখা গেলো না। উল্টো হরিণীর মতো ছুটে এসে খড়ের গাদার ওপর উঠে বসল। অকপটে বলল, ‘শোনো তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। তুমি আমার বন্ধু হবে?’ 


সাধারণ রাজ্যবাসী বলে রাজকন্যা নাকি পরীর মতো সুন্দর দেখতে। ইশানের গ্রামটা পাহাড়ের নিচে। বন্ধুরা মিলে সমুদ্রের ধারে আড্ডা দেবার সময় প্রায়ই তারা চোখ তুলে পাহাড়ের চুড়োয় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা রাজ দূর্গর গম্বুজ গুলো দেখত। বন্ধুদের অনেকেরই রাজকন্যাকে একবার চোখের দেখা দেখবার বড় শখ। তার নিজেরও যে কখনও শখ হয়নি তা না। হয়েছে বহুবার। অথচ আজ যখন সুযোগ হলো, তখন সেই ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকা আকাশের পরীর মতো রূপবতী রাজকন্যার দিকে চোখ তুলে তাকাবার মতো সাহস হলো না। কম্পমান বক্ষ নিয়ে শুধু নত মুখে দাঁড়িয়ে রইল নিশ্চল পাথরের মতো। মণিকা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ইশান এখনও চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। মণিকা চপল গলায় বলছে, ‘হ্যালো মাই ফ্রেন্ড!’ 


#উড়ান_মেঘের_দেশে, #oran_megher_deshe
#ওয়াসিক_নুযহাত, #wasika_nuzhat_faria


ইশান চোখ তুলে মণিকাকে দেখল একবার। প্রাসাদের সিঁড়িতে একদল কর্মচারী দাঁড়িয়ে আছে। একটু দূরে হাতে বন্দুক নিয়ে দণ্ডায়মান দুজন গম্ভীর মুখো প্রহরী। এরকম রাজকীয় পরিবেশের সম্মুখীন ইশান জীবনে প্রথমবারের মতো হলো। তার মনে হচ্ছে একটু এদিক সেদিক হলেই বুঝি তাকে গুলি করা হবে। মৃত্যুকে সে ভয় করে না। কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে অসুস্থ পিতা এবং নাবালক ভাইয়ের পরিণতির কথা ভাবতে গিয়েই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। মণিকার পাশে যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে তার পরনে সাদা শার্ট এবং কালো প্যান্ট। পায়ে বুট জুতো। মাথায় গোল হ্যাট। পিঠময় ছড়ানো রেশমি চুল। দামি পারফিউমের ঘ্রাণে বাতাস ভারী হয়ে আছে। রাজকন্যারা কী রকম দেখতে হয় ইশান তা জানে না। সে হ্যাটের নিচে একটি গোলগাল রাশান পুতুলের মতো ফর্সা মুখ দেখতে পাচ্ছে। গালের অগ্রভাগ লাল। ছোট তিনকোণা নাকের ডগায় চকচকে ভাব। দুটি বড় বড় পটলচেরা চোখ। যে চোখ দুটো এই মুহূর্তে ইশানের দিকে চকিত বিস্ময়ে চেয়ে আছে। কয়েকটা সেকেন্ড নির্বিঘ্নে কেটে গেলো। রাজকন্যার পটলচেরা চোখের পলক পড়ল না। ইশানও সমস্ত ভয় ভীতি অগ্রাহ্য করে রাশান পুতুলের মতো আদুরে মুখটার দিকে নির্নিমেষ চেয়ে রইল। মণিকা গলাটা একটু খাদে নামিয়ে বলল, ‘নীহার শোন, এই আমার বন্ধু ইশান। খুব সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করে।’ 


নীহারের মুখটা হঠাৎ ধারালো ক্ষুরধার ছুরিতে সূর্যের আলো পড়লে যেমন করে ঝলসে ওঠে, ঠিক তেমনি ভাবেই যেন ঝলসে উঠল। কর্কশ কণ্ঠে অনেকটা চেঁচিয়ে উঠে সে বলল, ‘তোর বন্ধু কি জানে না রাজকন্যাকে কী করে সম্মান দেখাতে হয়?’ 


মণিকার হাস্যোজ্জ্বল মুখ দপ করে নিভে গেলো। অনতিদূরে দাঁড়ানো প্রহরী দ্বয় মুহূর্তের মধ্যে বন্দুকের নল তাক করে ফেলল ইশানের দিকে। পরিস্থিতি বুঝে উঠতে একটু সময় লাগল ইশানের। রাজ পরিবারের কোন সদস্যর সাথে সাক্ষাতের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই তার। কী উপায়ে তাঁদের যথোপযুক্ত সম্মান দেখাতে হয় সেই বিষয়ে একেবারে অজ্ঞই বলা চলে তাকে। তাৎক্ষণিক ভাবে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল মাটিতে। হাতজোড় করে বলল, ‘মাননীয়া রাজকন্যা। ক্ষমা করবেন!’ 


নীহারের মুখের ঝলসানো তেজ এতেও কমল না। সে মুখ বাঁকা করে বলল, ‘এই ঘোড়ায় আমি চড়ব না। আমি বাবার কাছ থেকে অন্য ঘোড়া চেয়ে নেব। এটা আমার পছন্দ হয়নি।’ 


ঠিক সেই সময় প্রাসাদের চূড়া দণ্ডে বসে থাকা লাল ঝুটি কাকাতুয়া পাখিটি হিহি শব্দে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দ সমুদ্রকুঞ্জের আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। যেন সমস্ত পৃথিবী এক যোগে রাজকন্যাকে ভর্ৎসনা করে যাচ্ছে। পাখির টিটকিরি শুনতে পেয়ে মণিকার ঠোঁটে একটি তেরছা হাসির রেখাপাত ঘটল। এমনকি কর্মচারীদের মধ্যেও কেউ কেউ হাসি লুকোতে পারল না। রাজকন্যার রাগ এবার আকাশচুম্বি। চিৎকার করে বলে উঠল, ‘এই পাখিটা একটা হতচ্ছাড়া! ওকে খাঁচাবন্দি করো!’ 


মুহূর্তের মধ্যে লোকজন ছুটে গেলো পাখিটিকে ধরতে। মণিকা কুর্নিশ করে বলল, ‘মাননীয়া রাজকন্যা, আপনি অনুমতি দিলে আমি ঘোড়ায় চড়ে বসতে পারি।’ 


নীহার অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে দর্পিত কণ্ঠে হুকুম দিল, ‘তাই হোক!’

#উড়ান_মেঘের_দেশে, #oran_megher_deshe
#ওয়াসিক_নুযহাত, #wasika_nuzhat_faria

ইশান এতক্ষণ মাথা নত অবস্থায় হাঁটু গেঁড়ে বসে ছিল। হুকুম পেয়ে উঠে দাঁড়ালো। ঘোড়ার পিঠে ওঠার পা দানিটা দু হাত দিয়ে ধরে পুনরায় হাঁটু গেঁড়ে বসল ঘোড়ার পাশে। মণিকা পা দানিতে পা রাখল। ইশানের কাঁধে ভর দিয়ে উঠে বসল জিনের ওপর। ইশান দড়ি ধরে টানতে যাবে ঠিক সেই সময় রাজকন্যা বলে উঠল, ‘দাড়াও আমিও যাব!’

No comments

Powered by Blogger.