গল্প | উড়ান মেঘের দেশে - পর্ব-০৪ | Oran Megher Deshe - Part-04

লেখক | ওয়াসিকা নুযহাত

রাজকন্যার আদেশ শুনে উপস্থিত সকল লোক কিঞ্চিৎ বিস্মিত হলো। এই মাত্র তো তিনি বললেন ঘোড়াটা তাঁর পছন্দ হয়নি। এক মুহূর্ত গড়াতে না গড়াতেই মতের পরিবর্তন? দাসীদের মধ্যে একজন বেশ পুরনো। তার নাম শঙ্খবালা। সে রাজকন্যার বাল্যকাল থেকে এই প্রাসাদের সেবায় নিয়োজিত আছে। স্বাভাবিক ভাবেই অন্যান্য দাসীদের তুলনায় তার সাহস অল্প বিস্তর বেশি। স্বয়ং রানিমাও কদাচিৎ তার মতামতের গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। সে পা বাড়িয়ে এগিয়ে এসে বলল, ‘মাননীয়া রাজকন্যা, আপনার যদি ঘোড়াটি পছন্দ না হয়ে থাকে তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্য ঘোড়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আপনাকে এই ঘোড়ায় চড়তে হবে না।’ 


নীহারিকা দাপট সমৃদ্ধ কণ্ঠে ঘোষণা দিল, ‘আমার এই ঘোড়াই চাই।’ 


লালঝুঁটি কাকাতুয়া পাখিটিকে তখনও খাঁচাবন্দি করা সম্ভব হয়নি। রাজকন্যার মুখ নিঃসৃত সংলাপটা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই সে কলকল করে বলে উঠল, ‘ঠিক ঠিক ঠিক!’ 


একজন প্রহরী বলল, ‘পাখিটিকে কি গুলিবিদ্ধ করা হবে?’ 


-’খাঁচায় বন্দি করো। কেউ যেন ওকে হত্যা না করে।’ রাজকন্যার আদেশ। 


ইশান ঘোড়ার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে পাদানিটা যথার্থ রূপে প্রতিস্থাপন করল নীহারিকার পা জোড়ার সম্মুখে। ঊর্ধ্বনেত্রে চাইল একবার। নীহারিকার পটল চেরা দুটি চোখও তখন তামাভ্র তরুণটির মুখপানে নিবদ্ধ। ইশান দেখল রাজকন্যার শ্রীময়ী বদন খানিতে অহংকারের একটি সুদীপ্ত শিখা খেলছে। বিকেল শেষের চাঁপা ফুল রং রোদে সেই অহংকার ভরা চাউনিটাও যেন কেমন মোহনীয় হয়ে উঠল নিমেষে। আজকের দিনটি ইশানের জন্য নি:সন্দেহে অন্যরকম। জীবনে প্রথমবার রাজকন্যাকে সে স্বচক্ষে অবলোকন করছে। বন্ধুদেরকে এই অসম্ভব কল্পনাতীত ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে দেয়ার জন্য ভেতরটা হাঁসফাঁস করছে। সমুদ্রকুঞ্জের রাজকন্যা … যাকে ব্যক্তিগত ভৃত্য এবং প্রাসাদের প্রহরীরা বাদে রাজ্যের অন্যকোনো সাধারণ লোকে কস্মিনকালে দেখেনি, সাংবাদিকরাও কোনদিন যার ধারে কাছে ঘেঁষতে পারেনি, সেই ধরা ছোঁয়ার বাইরের অমূল্য রমণীরত্ন এই মুহূর্তে তার এতই নিকটবর্তী, যে চোখ তুলে ঊর্ধ্বমুখি হয়ে চাইলেই তাকে নজর ভরে দেখা যায়। উত্তেজনায় ইশানের বুক কাঁপছিল। ভয়ও হচ্ছিল কিঞ্চিৎ। রাজকীয়দের এতোটা সান্নিধ্য তার জীবনে এই প্রথম। শুনেছে এদের মধ্যে মায়াদয়ার বড়ই অভাব। মনের অজান্তে অমার্জনীয় কোনও অপরাধ করে ফেললে কী উপায় হবে? 

#উড়ান_মেঘের_দেশে, #oran_megher_deshe

#ওয়াসিক_নুযহাত, #wasika_nuzhat_faria

# banglastory143


নীহারিকা ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসল। মণিকার পেছনে। প্রহরী দুজনকে বলল, ‘আপনারা চলে যান। আমাদের সাথে আসতে হবে না।’


বলল ঠিকই, কিন্তু সে খুব ভালো মতোই অবগত যে প্রহরীরা যেকোনো উপায়ে তাদের এই যাত্রার ওপর নজরদারি করবে। তাছাড়া প্রাসাদের চত্বরের অভ্যন্তরে একাধিক সিসি ক্যামেরা অষ্ট প্রহর চোখ মেলে চেয়ে আছে। নীহারিকা কোনভাবেই ওই যন্ত্রের চোখ কে ফাঁকি দিতে পারবে না। অথচ কোনও কোনও সময়, বিশেষ করে এরকম আশ্চর্য সুন্দর বাসন্তী বিকেলগুলোতে, যখন হাওয়ারা বড় অবাধ্য, পাখিরা মাতোয়ারা, ভ্রমরেরা ফুলের নেশায় মত্ত ...তখন রাজকন্যা নীহারিকার এই জাঁকজমক পূর্ণ খোলসের ভেতরের সাধারণ বালিকা মনটাও কেমন অবাধ্য প্রজাপতির মতো ফরফরিয়ে উড়তে থাকে। তার ইচ্ছে করে মুক্ত বিহঙ্গ পাখির হয়ে অজানায় ছুটে যেতে। যেখানে কেউ তাকে চিনবে না, জানবে না, রাজকন্যা বলে আলাদা নজরদারি করবে না। আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতো সে দল বেঁধে কলেজে যাবে, ক্লাস করবে, ক্লাস শেষে বন্ধুরা মিলে হৈ হুল্লোড় করে চায়ের দোকানে আড্ডা দেবে। হুড খোলা গাড়িতে চড়ে সমুদ্রকুঞ্জের পথঘাট দেখতে দেখতে পাহাড়ের নিচের সাগর সৈকতে বেড়াতে যাবে। পৃথিবী বড় বিচিত্র জায়গা। শহরতলীর মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েরা রোজ যেখানে রাজকন্যা হবার স্বপ্ন বুকে নিয়ে বিষণ্ণ হতাশাগ্রস্ত দিবারাত্রি পার করে, সেখানে রাজকন্যার স্বপ্ন কিনা অতি সাধারণ এক মেয়ের জীবন যাপন করা। কী আশ্চর্য! 



ইশান ঘোড়ার দড়ি টেনে ধরে ধীরপায়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। মূল রাজভবনের হাজার ফিটের মধ্যেই রেসকোর্স ময়দান আছে। স্বয়ং মহারাজ সেই ময়দানে অশ্বচালনা করে থাকেন। মাঝে মাঝে রাজপুত্ররাও আসেন। ঘোড়ার রেস হয়। রাজকন্যাকে নিয়ে কি রেসকোর্সের দিকেই যাবে কিনা সে বিষয়ে কোন সিদ্ধান্তে এখনও উপনীত হতে পারেনি ইশান। কিছু জিজ্ঞাসা করার সাহসও হচ্ছে না। আড়ষ্টতায় গাঁট হয়ে আছে বুক। খানিকটা পথ এগোনোর পর মণিকা নীহারিকাকে বলল, ‘খুব তো বলছিলি ঘোড়াটা তোর পছন্দ হয়নি। যেই না আমি উঠে বসলাম অমনি হিংসা হয়ে গেলো? রাজকন্যাদেরও তাহলে হিংসে হয়?’ কথাটা বলে খিলখিল করে হাসতে লাগল মণিকা। নীহারিকার মুখটা অপমানে থমথম করে উঠল। মণিকার আক্কেল জ্ঞান বলতে কিছুই নেই। একজন ভৃত্য শ্রেণির লোকের সামনে সস্তা মানের রসিকতা করাটা যে বেমানান এই সহজ বিষয়টা তার গর্দভ মস্তিষ্কে ঢুকছে না। তাদের দুজনের মধ্যে যত ভালো বন্ধুত্বই থাকুক না কেন, নীহারিকা তো রাজ্যের রাজকন্যা। তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতিতে কথা বলার সময় ন্যূনতম সম্মান তো বজায় রাখা উচিত, নাকি? নীহারিকা একটু কর্কশ স্বরে সখীকে বলল, ‘হিংসে হবে কেন? এই ঘোড়া আমার তেমন একটা ভালো লাগেনি। আমার ইউনিকর্নের মতো সুন্দর রুপালি রঙের ঘোড়া চাই। কিন্তু মহারাজ নিজে পছন্দ করে একে আমার জন্য মনোনীত করেছেন বলে কথা। বাতিল করি কী করে?’ 



সম্মুখের পনের ফিট প্রস্থের রাস্তাটা সোজা চলে গেছে রাজবাড়ির মূল ফটক পর্যন্ত। বামে মোড় নিয়ে কিছুদূর এগোলেই রেসকোর্স ময়দান। রাস্তার দুধারে সবুজ ঘাস। ঘাসের ওপর ফুটে আছে নানা বর্ণের বুনো ফুল। ডানদিকের মাঠের শেষপ্রান্তে আছে একটি গোল চত্বর। যেখানে বছরের একটি সময়ে আড়ম্বর পূর্ণ তরবারি খেলার আয়োজন করা হয়। এই খেলা মরণ খেলা। অর্থাৎ যে জিতবে সে বেঁচে যাবে এবং যে মরবে তাকে চিরতরে প্রাণ হারাতে হবে। আধুনিক যুগেও সমুদ্রকুঞ্জে এমন অমানবিক খেলার প্রথা রয়ে গেছে। গণ মাধ্যমে এ নিয়ে অনেক তর্ক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু মহারাজ বীরবল পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য বিসর্জন দিতে নারাজ। ইশানের ছেলেবেলার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে একদিন এই মরণখেলায় অংশ নেবে । কিন্তু বাবার অসুখ ধরা পড়ার পর থেকে জীবনের প্রতি একটা মায়া জন্মে গেছে। সে এখন জানে তার অনুপস্থিতিতে বাবা আর ভাই না খেয়ে মরে যাবে। পৃথিবীতে তার বেঁচে থাকাটা এখন গুরুত্বপূর্ণ।  

  


ইশান খুব বিনীত ভঙ্গিতে মাথা নত রেখেই প্রশ্ন করল, ‘কোনদিকে যাব?’ 


মণিকা দুষ্টুমি ভরা গলায় বলল, ‘যেদিকে দুচোখ যায়!’ 


#উড়ান_মেঘের_দেশে, #oran_megher_deshe

#ওয়াসিক_নুযহাত, #wasika_nuzhat_faria

#banglastory143

নীহারিকা এবার একটু হালকা পাতলা ধমক দিয়ে উঠল, ‘তোর সবকিছুতে শুধু ফাজলামো!’ 


-’ শোন, তোর সাথে আমার বন্ধুর পরিচয় করিয়ে দিই। ওর নাম ইশান। ভীষণ সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করে।' 


ইশানের অস্বস্তি হচ্ছিল। মণিকা মেয়েটা যে পাগল সেটা প্রথম দিনই টের পেয়েছে সে। কিন্তু এখন পাগলামোর সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে। ইশান সাধারণ ছাপোষা মানুষ। রাজকন্যার সখির বন্ধু হবার যোগ্যতা কি তার আছে? তাছাড়া এরা এদের উদ্দেশ্যটাও তার কাছে পরিষ্কার নয়। ঘোড়া চালানো শিখতে চায়? নাকি শুধুই চড়তে চায়? তার তো এসব প্রশ্ন করার অধিকার নেই। নিজেকে একটা কলের পুতুল মনে হচ্ছে। দরিদ্র হবার অনেক জ্বালা! আত্মসম্মান বলতে কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। 


সাদা কেশরের সুন্দর সুগঠিত ঘোড়াটা মন্থর পায়ে হেলতে দুলতে এগিয়ে যাচ্ছিল। নীহারিকার চোখের দৃষ্টি ঘোড়ার ওপরে নয়, বরং চালকের ওপর নিবদ্ধ ছিল। মণিকার দেয়া বর্ণনার সাথে এই ছেলের কিছুই মেলে না। খুব সাধারণ একটা চেহারা। গায়ের রংও কালোর দিকে। চোখে মুখে কী রকম একটা দুঃখী দুঃখী ভাব। মণিকার আক্কেল থাকলে কোনদিন এরকম গেঁয়ো ছেলের প্রেমে পড়ত না। পথের ধারে কয়েকটা গাঢ় নীল রঙের ফুল ফুটে আছে। এই ফুলের নাম নীহারিকা। বসন্তের প্রথম দিন গুলোতে নীহারিকা ফুলে ফুলে রাজ্যের আনাচ কানাচ ভরে ওঠে। ফুলগুলোর সামনে দিয়ে যাবার সময় রাজকন্যা হুকুম করল, ‘দাঁড়াও এখানে।’ 


ইশান একটু তটস্থ হয়ে ঘোড়া সমেত দাঁড়িয়ে পড়ল। নীহারিকা ফুল গুলোর দিকে হাতের আঙ্গুল তাক করে বলল, ‘ওই ফুল গুলো আমাকে কুঁড়িয়ে এনে দাও।’ 


ইশান হুকুম তামিল করল। ঘোড়া দাঁড় করিয়ে রেখে কয়েক পা এগিয়ে বেশ কয়েকটা ফুল মুঠোভর্তি করে তুলে নিল। পেছন থেকে মণিকার রসিক কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, ‘হায় … রাজকন্যা নীহারিকার হাতেই নীহারিকা ফুল মানায়।’ 


ইশান জানত এই ফুলের নাম নীহারিকা কিন্তু রাজকন্যার নামও যে নীহারিকা একথা ছিল তার সম্পূর্ণ অজানা। সমুদ্রকুঞ্জে দুটি ফুল তার সবচাইতে প্রিয়। তার মধ্যে একটি হলো এই নীল রঙের নীহারিকা। বসন্তে তাজা নীহারিকার কলি এনে পড়ার টেবিলের ওপর রেখে দেয় সে। অসম্ভব সুন্দর ঘ্রাণে সারা ঘর ছেয়ে যায়। ইশানের হঠাৎ করেই কথাটা মাথায় এলো,  


আচ্ছা কে বেশি সুন্দর, এই নীল রঙের জংলি নীহারিকা? নাকি ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা প্রাসাদের সুসজ্জিত রাজকন্যা নীহারিকা? 


কথাটা মনে হতেই সে অসীম সাহসিকতার একটা কাজ করে ফেলল। ঘাড় ঘুরিয়ে সরাসরি তাকালো রাজকন্যার মুখের দিকে। তাকাতেই ওই চাঁপা ফুল রঙের রোদে ডোবা .... টিউ টিউ কোকিলের কলতানে ভরা ...... নীহারিকা ফুলের সুবাসমণ্ডিত মনোরম বিকেলটায় ইশানের বুকের ভেতরটা আচমকা কেমন এক আশ্চর্য কম্পনে কম্পিত হয়ে উঠল। কোনও মানুষের মুখের কারুকার্য যে এতো নিখুঁত হতে পারে তা সম্মুখের তরুণীটিকে নিজ চোখে না দেখলে সে কখনওই বিশ্বাস করত না। তার মনে জীবনানন্দ দাসের কবিতার চরণ কলকল করে কথা বলে উঠল। 


সে রাজকন্যার মুখের দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে বলল, 

 


চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,

মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর

হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা! 


-'কী বলছে এসব?’ ঝেঁঝে উঠল নিহারীকা। 


মনিকা হেসে প্রত্যুত্তর করল, ‘কবিতা মনে হয়!’ 


মুঠো ভর্তি নীহারিকা ফুল নিয়ে ইশান যখন রাজকন্যা নীহারিকার দিকে অগ্রসর হলো, তখন তার মুখে এক অপার্থিব হাসি। নীহারিকা সেই অপার্থিব হাসির দিকে একদৃষ্টে চেয়ে ছিল। তার মনে হচ্ছিল এই টানা টানা চোখের তামাভ্র ছেলেটা কোন সাধারণ মানুষ নয়। সাধারণ মানুষের হাসি এরকম হয় না। ফুলগুলো হাতে তুলে দেবার সময় ইশানের আঙ্গুলের ছোঁয়া লেগে গেলো রাজকন্যার আঙ্গুলে। রাজকন্যার কখনও কোনও পুরুষের অঙ্গ স্পর্শ হয়নি। তার ব্যক্তিগত ভৃত্যদের মধ্যে সকলেই নারী। প্রহরীরা কেউ কখনও তার ধারে কাছে আসার সাহস পায়নি। এই ছেলেটির স্পর্ধা দেখে সে বিস্মিত না হয়ে পারছে না। আঙ্গুলে আঙ্গুল লেগে যাবার পরেও ক্ষমা চাইবার কোনও বালাই নেই, উপরন্তু কেমন অপলক চেয়ে আছে মুখপানে। ফুলগুলো হাতে তুলে নিয়ে রাজকন্যা চাপা রাগে গর্জে উঠে বলল, ‘তুমি আমার হাত ছুঁয়ে দিলে কেন?’ 


ইশানের মুখ থেকে অপার্থিব হাসিটি তখনও মুছে যায়নি। সে হাসি হাসি মুখ নিয়েই বলল, ‘নীহারিকা ফুল আমার হাতেই ছিল। আলাদা করে তার হাত ছুঁতে হবে কেন?’ 


#উড়ান_মেঘের_দেশে, #oran_megher_deshe

#ওয়াসিক_নুযহাত, #wasika_nuzhat_faria

#banglastory143

কী দুঃসাহস! রাজকন্যা এবং তার সখী আস্তাবলের কর্মচারীর এই দুঃসাহসিক বাকপটুতায় একদম স্তব্ধ হয়ে গেলো। ক্ষণকাল অতিবাহিত হবার পর নীহারিকা হুঙ্কার ছেড়ে বলল, ‘তোমার স্পর্ধা তো কম নয়! তুমি আমার নাম নিয়ে রসিকতা করছ? দাঁড়াও, এর শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে!’ 


ইশানের যেন এতক্ষণে সম্বিৎ ফিরল। সে তটস্থ গলায় বলল, ‘ক্ষমা করবেন মাননীয়া, আমি ইচ্ছে করে কাজটা করিনি। ভুল হয়ে গেছে।’ 


-’এই ভুল ক্ষমার অযোগ্য। তোমাকে শাস্তি পেতে হবে।’ 


মনিকা নীহারিকার কানে কানে বলল, ‘এক কাজ কর, শাস্তি স্বরূপ এর সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দে। তারপর জীবনভর অত্যাচার করব।’ 


মণিকার ছেলেমানুষি কথা শুনে নীহারিকা এবার হাসি দমিয়ে রাখতে পারল না। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসিটাকে ঢোঁক গিলে ফেলতে চাইল সে। ইশান মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে ধনীর দুই দুলালী এই মুহূর্তে তাকে নিয়ে রসিকতায় মেতে উঠেছে। এই রসিকতা তার পুরুষোচিত আত্মসম্মানে আঘাত হানছে। কিন্তু চুপ করে অপমান সহ্য করা ছাড়া তার আর কোনও উপায়ান্তর নেই। 


নীহারিকা বিজ্ঞ গলায় সখির সাথে শলা পরামর্শ করতে লাগল, ‘কী শাস্তি দেয়া যায়?’


-’একশ বেত্রাঘাত!’ মণিকার মতামত। 


-’ মরে যাবে। কী রকম বাঁশের মতো শুকনা দেখিস না? খেতে পায় না মনে হয়।’ 


ইশান দাঁতে দাঁত চেপে মন্তব্যটা হজম করল। সে নাকি বাঁশের মতো শুকনা .. .. হ্যাঁ তার শরীরে মেদ নেই। এই বয়সে থাকেও না কারো।কিন্তু তাই বলে তাকে দুর্বল ভাবার কোনও সুযোগ নেই। পাঞ্জা লড়ায় আজ পর্যন্ত বন্ধুরা কেউ তাকে হারাতে পারেনি। 


-’তাহলে পাঁচশ বার কান ধরে ওঠবস করতে হবে।’ খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল মনিকা। 


-’এটা মন্দ নয়। তবে তাই হোক।’ গলায় কপট গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলে রাজকন্যা সায় দিল। 


#উড়ান_মেঘের_দেশে, #oran_megher_deshe

#ওয়াসিক_নুযহাত, #wasika_nuzhat_faria

#banglastory143 

ইশান রাগটাকে দমিয়ে রেখে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল শুধু। নড়ল না, কিছু বললও না। নীহারিকার গলার স্বরে এখন স্বভাব সুলভ চপলতা ফিরে এসেছে। এই দরিদ্র ঘরের বালকটি যেন তার খেলার পুতুল। একে নিয়ে সে যা ইচ্ছে করতে পারে। সে হুকুম দেয়ার স্বরে বলল, ‘আমার মহলের সামনে দাঁড়িয়ে তুমি পাঁচশ বার কান ধরে ওঠা বসা করবে। এটাই হবে তোমার শাস্তি।’


সহজ সরল কোমলমতি রাজকন্যা তখনও জানে না, একজন নিরীহ বালককে খেলার ছলে শাস্তি দেবার সিদ্ধান্ত নিয়ে সে যে ভুলটা করতে যাচ্ছে, সেই ভুল পরবর্তী কয়েকটা দিন তার নিরবচ্ছিন্ন অশ্রুজলের কারণ হবে।  


সাগরঘেঁষা লাইটহাউজের ঘড়িতে ঢং ঢং করে বিকেল পাঁচটার ঘণ্টা বাজল। ঠিক সেই সময় রাজবাড়ির মূল ফটকের সামনে ভাড়া করা ট্যাক্সি থেকে অবতরণ করল একজন তেইশ বছরের তরুণী। তরুণীর নাম রাশিকা। সে এসেছে বাংলাদেশ থেকে। সমুদ্রকুঞ্জে এই তার প্রথম সফর। সফরের উদ্দেশ্য সদ্য প্রাপ্ত চাকরি। সে একজন রন্ধন শিল্পী। রাজবাড়ির হেঁশেলে রান্না করার দায়িত্ব পেয়েছে সে ছমাসের জন্য। বাল্যকাল থেকেই প্রতিবেশী দেশ সমুদ্রকুঞ্জে একবার পদচারণ করার ইচ্ছে ছিল তার। অবশেষে আজন্ম লালিত স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তার অনেক দিনের ইচ্ছা সমুদ্রকুঞ্জের বড় রাজকুমারকে একবার সামনা সামনি দেখবে। ফেসবুক ইন্সটাগ্রামে বড় কুমারের ছবি এবং কার্যকলাপ দেখে সে এতটাই মুগ্ধ হয়েছে যে তার ধারণা, এই যুবকের সাথে একবার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলতে না পারলে জীবন বৃথা। 


এই মুহূর্তে রাশিকা রাজবাড়ির ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে স্যুটকেস। কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ। পরনে একটি থ্রি কোয়ার্টার মোবাইল প্যান্ট, গোলাপি টিশার্ট। চুল কাটার ধরণটাকে পশ্চিমা দেশে বলে ইনভার্টেড বব কাট। সিল্কের মতো নরম রেশমি চুলগুলো কানের দুই ধারে লম্বা এবং ঘাড় বরাবর ছোট করে ছাটা। সুচালো চিবুকটায় একটা চমৎকার খাঁজ আছে যার ইংরেজি নাম ‘ডিম্পল’ । নাকটা ছোট এবং আদুরে। শ্যামবর্ণ গায়ের ত্বক। বড় বড় ডাগর দুটি চোখ। স্বভাব চঞ্চল হরিণীর ন্যায় দুরন্ত। বাংলাদেশি লেখক ওয়াসিকা নুযহাতের উপন্যাস মন সায়রের পাড়ে’ র কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র নুহার মতোই কিছুটা বাঁচাল প্রকৃতির এই মেয়ে। কোথায় কী বলতে হয় জানে না। বাস্তব জ্ঞান একেবারে শূন্যের কোটায়।  



রাশিকা এর আগে কখনও কোনও রাজবাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেনি। শুধু নাটক সিনেমায় দেখেছে। আজকে তার মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত রোমাঞ্চ হচ্ছে। সে ঘাড় উঁচু করে চেয়ে আছে প্রাসাদের সুউচ্চ গম্বুজের দিকে। এই রাজ পরিবার নিয়ে অনেক গল্প শুনে এসেছে ছোট বেলা থেকে। বড় রাজকুমার তুর্যয়কে সে মন দিয়েছে সেই কিশোরী বেলায়। তুর্যয় তার স্বপ্নের রাজকুমার! 


রাজবাড়ি থেকে তাকে একটি নিয়োগপত্র দেয়া হয়েছে। ঢোকার সময় প্রহরীকে সেই নিয়োগপত্র দেখাতে হবে। সে কাঁপা হাতে ব্যাগ থেকে নিয়োগপত্রটা বের করে নিল। এমন সময় পেছন থেকে ভেসে এলো একটা কণ্ঠস্বর , ‘আপনি কে? কাকে চাই?’


#উড়ান_মেঘের_দেশে, #oran_megher_deshe

#ওয়াসিক_নুযহাত, #wasika_nuzhat_faria

----------------------------------------------

(সর্ব প্রথম ফ্যান্টাসি গল্প লিখেছিলাম ক্লাস সিক্সে পড়াকালীন। নাম ছিল 'তরু' । কোথাও প্রকাশিত হয়নি। আমাদের ঢাকার বাসার আলমারির ড্রয়ারে পান্ডুলিপিটা পড়ে আছে অবহেলায়। দ্বিতীয়বার লিখলাম আরেকটু বড় হয়ে। নাম 'পরী'। গল্পটা ছাপা হয়েছিল 'কিশোর তারকালোক' পত্রিকায়। পরবর্তীতে মেট্রোপলিটন গল্পগুচ্ছতেও প্রকাশ পেয়েছিল। তৃতীয়বার ফ্যান্টাসি জনারার গল্প লিখেছিলাম দু হাজার সতের সালে। নাম 'অদৃশ্য নগরী' । গল্পটা বইমেলায় প্রকাশিত হলো বাংলার প্রকাশনের গল্প সংকলনে। অনলাইনেও পোস্ট করলাম। অনেকেই অনুরোধ করল সিকুয়েল লেখার জন্য। তখনই মনে মনে ঠিক করেছিলাম বেঁচে থাকলে অদৃশ্য নগরী সমুদ্রকুঞ্জর প্লট নিয়ে একটি উপন্যাস লিখব। কিন্তু ছোট গল্প লিখে থাকলেও এই জনারায় উপন্যাস আমি আগে লিখিনি যেটা প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছিলাম। 

#banglastory143

উড়ান মেঘের দেশে মূলত ছোট গল্প অদৃশ্য নগরীরই পরিবর্ধিত এবং পরিমার্জিত ভার্সন হতে যাচ্ছে। যেহেতু উপন্যাস, তাই কাহিনী অন্যরকম ভাবে সাজাতে হচ্ছে। মূল গল্পে মিল নেই তবে প্লট গড়ে উঠেছে সমুদ্রকুঞ্জকে ঘিরেই। আপনাদের কেমন লাগছে জানি না। পাশে থেকে অনুপ্রেরণা দিলে 'উড়ান মেঘের দেশে' হয়তো ভালো কিছু হলেও হতে পারে ইন শা আল্লাহ।)

No comments

Powered by Blogger.