জাফরিন -পর্ব-১০ | Jafrin - Part-10

গল্প | #জাফরিন 💫
পর্ব | ১০
লেখক | আস্থা রাহমান শান্ত্বনা 




আহিন উদাসচোখে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে এক্ষুণি হয়ত জাফরিন সেখানে দৃশ্যমান হবে এবং পা দোলাতে দোলাতে চোখ বড় বড় করে আহিনের দিকে তাকিয়ে হাসি দিবে।


আহিনের চোখ দুটো মূহুর্তেই ঝাপসা হয়ে এল, সে শোয়া থেকে উঠে বসে একহাতে মাথার চুল মুঠো করে ধরে চোখ বুজে রাখে। জাফরিন তো তার মনের কথা সব বুঝত, এটা বুঝতে পারেনি সে খুব করে চাইছিল জাফরিন তার কাছে থাকুক। আর ভাবতে পারছেনা আহিন, জাফরিনকে ছাড়া ঘরটা ভীষণ শূণ্য লাগছে। 


আয়শা খানম পাশে দাঁড়িয়ে ছেলেটার মাথায় আলতো করে হাত রাখলেন। আহিন চমকে উঠে ঠিক হয়ে বসল। 
#জাফরিন_পর্ব_১০
#jafrin_part_10
#https://banglastory143.blogspot.com/


"এত ভাবলে কি সে ফিরে আসবে? সে মায়া লাগাতে এসেছিল, মায়া লাগিয়ে চলে গেছে। তার যদি যাওয়ার হত, তোকে মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল বুঝলে আরো আগে কেন গেলনা!" 


" আমি জানিনা। এসব নিয়ে কোনো প্রশ্ন করোনা মা।" 


আয়শা খানম চুপ হয়ে গেলেন। ছেলে তার স্বীকার করুক বা না করুক দুজনের মধ্যে কিছু তো একটা হয়েছে যার জন্য জাফরিন কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে গেছে। 


আয়শা খানমের একবার মনে হল শ্বশুড়কে জিজ্ঞেস করবে, "জাফরিন তার বাপের বাড়ী গেছে কিনা!" 


পরক্ষণেই মনে পড়ল, তার শ্বশুড় তাকে আগেই বলেছিলেন জাফরিন এতিম, ছোটবেলায় তার জায়গা হয় এতিমখানায়। মেয়েটার জন্য বেশ টান অনুভব করছেন তিনি। 


আহিন অভিমানে প্রথম প্রথম জাফরিনের কথা মনে আনতে না চাইলেও এখন খুব খারাপ লাগে, মনে না এনে থাকতে পারেনা। রাতে ছাদে উঠে বসে থাকে, এই আশায় জাফরিন আবার ফিরবে। 


অহনা কফির কাপটা টেবিলের উপর রেখে নীচু গলায় বলল, "তুই ভাবীর রাগ ভাঙ্গিয়ে ফিরিয়ে আনতে পারিসনা!" 


আহিন কফির কাপটা তুলে চুমুক দিয়ে ভাবতে থাকে, অহনাকে জাফরিন চড় মারার পরও অহনা কোনো টু শব্দ করেনি, জাফরিনের উপর রাগ ও করেনি। 


অথচ ওকে কেউ একটু বকে দিলে তার সাথে তুলকালাম করে ছাড়ে। অহনাকে কাছে ডেকে পাশে বসায় আহিন।
"সত্যি করে একটা কথা বলবি?"
"কি কথা?" 


"জাফরিন তোকে সেদিন চড় মেরেছিল কেন?"
অহনা চুপ হয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে। লজ্জায় তার মুখ লালবর্ণ ধারণ করেছে, মনে মনে ভাবছে ভাইয়া কে কিভাবে বলবে সে কথা! অহনা আস্তে করে বলল,
"সে কথা আমি তোকে বলতে পারবনা।" 


"কেন? কি এমন করেছিস তুই যে তোকে চড় মারল!" 
#জাফরিন_পর্ব_১০
#jafrin_part_10
#https://banglastory143.blogspot.com/


"ভাবী বারবার সাবধান করার পরও তার কথা শুনিনি, তাই শাসন করেছে। এর চেয়ে আর বেশী কিছু বলতে পারবনা।" 


আহিন আর জোর করলনা। অন্য প্রসঙ্গে বলল,
"তোর মনে হয় জাফরিন ছাদ থেকে মাকে ফেলে দিতে পারে?" অহনা চোখ তুলে আহিনের দিকে তাকায়। 


"এটা আমার বিশ্বাস হয়না ভাইয়া। আমার মনে হয় মা মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল, ভাবীর সাথে তখন তো একটু মন কষাকষি ছিল তাই হয়ত ভাবীর ঘাড়ে দোষ দিতে চেয়েছে।" 


আহিন চুপ করে রইল। এই কথাটা গ্রহণযোগ্য হলেও এটা মানতে পারছেনা। মা যদি জাফরিনকে মিথ্যা বলে দোষী করতে চাইত তবে এটা কখনোই বলতে পারতনা জাফরিন পা দোলাতে দোলাতে খাবলা তুলে মাংস খাচ্ছিল। 


সব কেমন যেন এলোমেলো লাগছে তার। কোনো হিসাবে জাফরিন ক্ষতি করতে পারে বলে মনে হয়না, কোনো হিসাবে পুরো উল্টাটাই মনে হয়। 


মোতালেব খা আধশোয়া অবস্থায় চোখ বুজে আছেন। এমনসময় আহিন সালাম দিয়ে তার পাশে বসল। মোতালেব খা সালামের উত্তর দিয়ে পা গুটিয়ে বসে আহিনের দিকে তাকালেন। ছেলেটার মুখ-চোখ অনেক শুকিয়ে গেছে। আহিন শান্তগলায় জিজ্ঞেস করল, 


" দাদা আপনি জানেন জাফরিন কোথায় যেতে পারে?" 


"যদি জানতাম এক্ষুণি ওকে ঘাড় ধরে এখানে নিয়ে আনতাম। কিন্তু আগে এটা জানা দরকার, ও এখান থেকে কেন চলে গেল? তুমি কি বলেছো ওকে?" 


"স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তো সামান্য মনোমালিন্য হয় দাদা। ওর বাবার বাড়ীতে যায়নি তো?" 
#জাফরিন_পর্ব_১০
#jafrin_part_10
#https://banglastory143.blogspot.com/


"ওর বাবার বাড়ি নেই। ও এতিমখানায় বড় হয়েছে। একদিন পথে আমি স্ট্রোক করেছিলাম, আল্লাহর রহমতে ওর বুদ্ধিতে বেঁচে গেছিলাম। তখন ই ঠিক করে নিই, ওকে আমার নাতবউ করব।" 


আহিন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, তাহলে তার ধারণা ই ঠিক। জাফরিন যে একজন পরী এই বিষয়ে দাদাও অবগত নন। কিন্তু জাফরিনকে এখন খুঁজবে কোথায় সে! কোথায় পাবে তাকে? জাফরিনকে ছাড়া থাকতে তার কষ্ট হচ্ছে ভীষণ।
 

জাফরিন বেহুশ অবস্থায় বদ্ধ ঘরে চিৎ হয়ে পড়ে আছে। বাহিরে জ্বলতে থাকা মশালের আলো জানলার এক কোণ দিয়ে ঢুকে পড়ে ঘরটাকে কিছুটা আলোকিত করে রেখেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে জ্ঞান ফিরে এল জাফরিনের। 


নিজেকে বদ্ধ ঘরে দেখে খুব একটা অবাক হলনা, যেন সে জানত এখানে তাকে আনা হবে। দরজা খোলার শব্দে জাফরিন কিছুটা কেপে উঠল, নিজেকে যতটা সম্ভব গুটিয়ে নিল। একটা শক্ত-সামর্থ্যবান লোক মোটা চাবুক হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকল। 


তার গালভর্তি দাড়ি-গোফ, তান্ত্রিক-সাধকদের মত পোশাক পড়া। চাবুক অন্য হাতে পেচাতে পেচাতে জাফরিনকে কেন্দ্র করে তার চারপাশে ঘুরতে লাগল। 


"আমাকে এখানে ধরে এনেছেন কেন? আমি তো বললাম আমি আপনার আর কোনো কথা ই শুনবনা।" 


লোকটা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। হাসি থামিয়ে বলল,
"আমার কষ্টের ফল এভাবে জলে যেতে দিই কি করে?" 

#জাফরিন_পর্ব_১০
#jafrin_part_10
#https://banglastory143.blogspot.com/

বলেই কিসব বিড়বিড় করতে করতে জাফরিনের গায়ে চাবুক দিয়ে সজোড়ে আঘাত করতে শুরু করল।
জাফরিন ব্যথা সহ্য করতে না পেরে মেঝেতে আছড়ে পড়ে ছটফট করতে লাগল। লোকটা তাতে ক্ষান্ত হলনা, জামার কোটর থেকে কিসব বের করে জাফরিনের গায়ে ছুড়ে মারল।
ওইসব গায়ে পড়তে জাফরিনের শরীরে জ্বালা শুরু করল। "অনেক হয়েছে, এবার আমাকে প্রতিশোধ নিতে দিন।" 


বলে আরেকজন ঘরটিতে ঢুকল। জাফরিন চোখটা পুরোপুরি মেলার চেষ্টা করে দেখতে চাইল কে সে! 


কিছুটা বিস্মিত হয়ে অস্ফুটস্বরে রাগমিশ্রিত স্বরে বলল, "লুচুব্যাটা।" 


রিফাত লোকটার হাত থেকে চাবুক নিয়ে জাফরিনকে আঘাত করা শুরু করল। একটু থেমে বলল, 


"কি ভেবেছিস? আমার এত বড় ক্ষতি করেও তুই পার পেয়ে যাবি! এই দিনটার ই অপেক্ষায় ছিলাম আমি। আজ সবকিছুর শোধ নিয়ে ছাড়ব।" 


জাফরিন লালচোখে রিফাতের দিকে তাকাল।
"ওইভাবে তাকাসনা, আজ তোর কিছু করার ক্ষমতা নেই। তোর মৃত্যুর সময় এসে গেছে।" 


"এত খুশি হসনা, আমি যে কতটা ভয়ংকর হতে পারি সেটা তুই হাড়ে হাড়ে টের পাবি!" রিফাত আবার চাবুক চালাতে চালাতে বলল, 


"সেই সুযোগ তোকে আর দিবনা আমি। তোর স্বামীর হাতেই তোকে মারব আমি।" রিফাত লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, "আপনি সেই ব্যবস্থা করুন।" 


"ওকে আমি বোতলে ভরে দিচ্ছি। আপনি সেটা কোনো এক নির্জন জায়গায় কিছু একটা দিয়ে পুতে দিবেন। সেই জায়গায় যদি তার স্বামী তাজা রক্ত ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়, সেই আগুনে পুড়ে মরবে জাফরিন।" 


বলেই লোকটা জাফরিন কে বোতলবন্ধি করল। রিফাত বোতল টা হাতে নিয়ে বলল, 
"এবার দেখ, আমার প্রতিশোধ কতটা ভয়ংকর হয়।"
জাফরিন কি করবে বুঝে উঠতে পারলনা, আহিন কি সত্যিই রিফাতের কথায় তাকে মেরে ফেলবে! 


রিফাত আহিনকে মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখে বলল, "জাফরিন চলে গেছে তাতে তো তোর খুশি হওয়ার কথা। এই ডাইনীটাকে তো তুই ই তাড়াতে চেয়েছিস।"


আহিন ক্ষেপে গিয়ে বলল, "ও মোটেও ডাইনী নয়। হ্যা, একসময় চেয়েছিলাম, এখন ওকে ফিরে পেতে চাই আমি।" 
#জাফরিন_পর্ব_১০
#jafrin_part_10
#https://banglastory143.blogspot.com/


রিফাত ভ্রু কুচকে আহিনের দিকে তাকায়। ভেবেছিল, আহিনকে জাফরিনকে মারার উপায় টা বলে নিজের প্রতিশোধ পূরণ করবে। এখন যা মনে হচ্ছে, আহিন জাফরিনের প্রতি দূর্বল হয়ে গেছে। এই অবস্থায় সত্যটা বললে আহিন তো জাফরিনকে মারবেই না, উলটো রিফাতকে উত্তম-মাধ্যম দিবে। 


কিন্তু সে তো কিছুতেই নিজের এত কষ্ট বৃথা যেতে দিবেনা। যে করে হোক, আহিনের হাতেই জাফরিনকে মারবে, জাফরিনের পুড়ার দৃশ্য দেখে অনেক আনন্দ লাগবে তার। 


"একটা কাজ করে তুই জাফরিনকে ফিরে পেতে পারিস।"
খুশিতে আহিনের চোখ চকচক করে উঠল, সে রিফাতের হাত জড়িয়ে বলল, "কিভাবে সম্ভব!"


রিফাত ঠোটের হাসিটা প্রসন্ন করে আশ্বাসের দৃষ্টিতে আহিনের দিকে তাকায়। সুযোগের সদ্ব্যবহার করার এই তো সময়। 


দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের শিখার দিকে তাকিয়ে আছে আহিন আর রিফাত। আহিনের চোখ দুটো আশায় চকচক করছে, এবার জাফরিন তার কাছে ফিরে আসবে।
 

রিফাতের খুব মন খুলে হাসতে ইচ্ছে করছে, তার বহুদিনের ক্রোধ আজ মিটাচ্ছে। বোতলের কাচ গলার শব্দ তাকে খুব আনন্দিত করছে, ওই বোতলে থাকা বন্দি জাফরিন নিশ্চয়ই আর্তনাদ করতে করতে জ্বলে ছাই হয়ে যাচ্ছে। ভেবেই রিফাতের শান্তি লাগছে...
#জাফরিন_পর্ব_১০
#jafrin_part_10
#https://banglastory143.blogspot.com/



🔰 🔰 🔰 চলবে 🔰 🔰 🔰

No comments

Powered by Blogger.