জাফরিন -পর্ব-০৯ | Jafrin -Part-09
গল্প | #জাফরিন 💫
পর্ব | ০৯
লেখক | আস্থা রাহমান শান্ত্বনা

পর পর দু'বার একই কথা শুনে আহিন আর চুপ থাকতে পারলনা, এবার তার সত্যিই মনে হচ্ছে জাফরিন মজা করে কথাটা বলেনি। বইটা বন্ধ করে রেখে বলল।
"কোথায় যাবেন?"
#jafrin_part_09
#https://banglastory143.blogspot.com/
খানিকটা নিস্তব্ধতা। জাফরিনকে চুপ থাকতে দেখে আহিন তার পাশে এসে দাড়াল। জাফরিনকে আজ একদম অন্য রকম লাগছে। মনে হচ্ছে একটা ছোট্ট নিষ্পাপ বাচ্চা, পৃথিবীর সব মায়া ওর স্নিগ্ধ কোমল মুখটায় জড়ো হয়েছে। জাফরিন জানালার গ্রীল ধরে বাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
"যেখান থেকে তোর জীবনে এসেছিলাম। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, আমি চিরদিনের মত তোর থেকে দূরে চলে যাব।"
কথাটা শুনে আহিনের বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল, এক অজানা কষ্টে তার মন ভার হয়ে এল। কেন এমন হচ্ছে তার!
"কেন ই বা এসেছিলেন আর কেন ই চলে যাবেন?"
"সেসব না হয় অজানা ই থাক।"
"সত্যিই চলে যাবেন?"
কথাটা বলতে গিয়ে আহিনের চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। সেটা লুকানোর জন্য অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল সে। জাফরিনের আহিনের দিকে তাকিয়ে একটা উপহাসের হাসি দিয়ে বলল,
"সেটাই তো চেয়েছিলি। কত চেষ্টা'ই না তোর বৃথা গেল।"
আহিন জাফরিনকে কিভাবে বুঝাবে, সে আজ খুব করে চাচ্ছে জাফরিন তার কাছে থাকুক, তাকে খুব করে জ্বালাক।
এটা ঠিক, জাফরিনকে একসময় সে অনেক তাড়াতে চেয়েছিল, চেয়েছিল জাফরিন তার জীবন থেকে দূর হোক। কিন্তু আজ তার চলে যাওয়ার কথা ভাবলেই বুকের বা'পাশটা চিনচিন করে উঠে। আহিনের প্রচন্ড শখ হচ্ছে জাফরিনের হাত দুটো শক্ত চেপে ধরে বলতে, "আপনি কোথাও যেতে পারবেন না, সারাজীবন আমার কাছে ই থাকবেন।"
কিন্তু কেমন যেন ইতস্তত বোধ হচ্ছে তার। ভীষণ ভয় হচ্ছে অধিকার দেখাতে। জাফরিনকে এভাবে বললে কি সে বুঝতে পারবে আহিনের মনে কি চলছে। কেন আহিন চাচ্ছেনা সে চলে যাক!
জাফরিন শান্তদৃষ্টিতে আহিনের দিকে তাকিয়ে বলল, "জানিস, আমি খুব খারাপ একটা পরী। তাদের দলের অন্তর্ভুক্ত যারা মানুষের ক্ষতি করে বেড়ায়। আমার কাজ ই হচ্ছে অন্যকে তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মেরে ফেলা কিংবা পাগল করে দেওয়া।"
কথাগুলো শুনে আহিনের কোনো রিয়েকশান ই হচ্ছেনা। তার এসব শুনতে ভালোলাগছেনা একদম ই।
#জাফরিন_পর্ব_০৯
#jafrin_part_09
#https://banglastory143.blogspot.com/
আহিন প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলল, "এখন কি আমার উপর অতিষ্ঠ হয়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন?"
"কারো উপর আমার সিদ্ধান্ত নির্ভর করেনা। কারো কোনো কিছুই আমাকে স্পর্শ করেনা। আমি যে সিদ্ধান্ত নিই তাতে আমি অটল থাকি।"
আহিনের কেমন জানি কান্না পেয়ে যাচ্ছিল। ভেবেছিল, কথার এক পর্যায়ে জাফরিনের হাত টেনে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলবে, "কোথাও যাবেননা আপনি। আপনাকে ছাড়া থাকার কথা ভাবলেই আমার কষ্ট হয়।" কিন্তু সেটা বলার মত মানসিকতা জাফরিন ভেঙ্গে দিল।
আহিন এখন আর মনের ভাবটা জাফরিনকে প্রকাশ করতে চায়না, কারণ জাফরিন তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে কারো কথায় তার সিদ্ধান্ত বদলাবেনা। আহিনের খুব অভিমান হল।
সেও সিদ্ধান্ত নিল, জাফরিনকে সে আটকাবেনা। যে নিজের ইচ্ছেতে এসেছে, সে নিজের ইচ্ছেতেই চলে যাচ্ছে। কারো কথা ভাবার প্রয়োজনবোধ করছেনা। এমন একটা স্বার্থপরকে নিজের মনের কথা বলে কিছুতেই ছোট হবেনা আহিন।
নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
"কখন চলে যাবেন তাহলে?"
জাফরিন ছোট্ট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মাঝ আঙ্গুলের ডগা দিয়ে চোখের কোণে জমে থাকা পানিটা মুছে নিয়ে বলল, "যেকোনো সময়।"
"ভালো থাকবেন। যেখানে থাকুন, আপনার ভালো থাকাটাই কামনা করি।" বলে আহিন রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
ছাদে এসে দরজা বন্ধ করে দিয়ে খুব কাদল আহিন। কেন এমন লাগছে তার! এই মেয়েটাকে তো সে খুব ঘৃণা করত তাহলে তার জন্য এত কষ্ট কেন হচ্ছে তার! কিসের এত তাগিদ তাকে নিজের কাছে রাখার।
জাফরিন টেবিলে নাস্তা দিচ্ছে, আহিন অফিসের জন্য বের হচ্ছে এমন সময় মোতালেব খা পিছন থেকে ডেকে বলল,
"না খেয়ে কোথায় যাচ্ছো?"
"অফিসে যাচ্ছি, জরুরী কাজ আছে।"
"খেয়ে যাও।"
দাদার পিড়াপিড়িতে আহিনের টেবিলের এক কোণায় বসে পড়ল। আড়চোখে জাফরিনের দিকে তাকাল সে, চুপচাপ লক্ষী মেয়ের মত সবাইকে নাস্তা দিচ্ছে জাফরিন।
#জাফরিন_পর্ব_০৯
#jafrin_part_09
#https://banglastory143.blogspot.com/
পাতা রঙ্গের সোনালি পাড়ের একটা শাড়ি পড়েছে সে, চুলগুলো মাঝ বরাবর সিথি করে কোনোরকমে হাতখোপা করা। দু-একটা চুল মুখের সামনে এসে বিরক্ত করছে। শাড়ির আচলটা সংসারী বউদের মত কোমড়ে গুজে রেখেছে।
আহিন আর সহ্য করতে পারলনা, চোখ সরিয়ে নিল। জাফরিনের এমন সংসারী রুপ দেখে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে, জাফরিনের সাথে ভীষণ সুখের একটা দাম্পত্য জীবনে আবদ্ধ আছে সে। যার সংসার ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। জাফরিনের এমন কোমলময়ী মুখ দেখে আর আবেগপ্লুত অসম্ভব ভাবনা ভাবতে চায়না আহিন, তাই খুব তড়িঘড়ি করে অফিসের জন্য বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল।
কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, জাফরিন এড়িয়ে চলা তার পক্ষে সম্ভব না। কোনো একটা শক্তি তাকে বারবার জাফরিনের দিকে টেনে আনছে। কিন্তু আহিন যা ভাবছে তা আদৌ কখনোই সম্ভব নয়। জাফরিন এটা হয়ত মেনেও নিবেনা। তাই যেভাবেই হোক, জাফরিন থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে।
আকাশ-কুসুম বিস্তীর্ণ আবেগের স্বপ্ন দেখে নিজেকে কষ্ট দেওয়া উচিত হবেনা। তাহলে জাফরিন চলে গেলে নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারবে।
জাফরিন আহিনকে পিছন থেকে ডেকে ব্যাগে টিফিন বক্স ঢুকিয়ে দিল। আহিন আর একবারো জাফরিনের চোখের দিকে তাকালনা।
"ফেরার সময় আমার জন্য রজনীগন্ধা ফুল নিয়ে আসতে পারবি?"
আহিন কিছু না বলে চলে যেতে নিলে জাফরিন পথ আগলে দাঁড়িয়ে বলল, "উত্তর দিলি না যে!"
আহিন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলনা। মেয়েটা কেন অযথা মায়া বাড়াচ্ছে! জানেনা সে, এগুলোতে আহিনের কেবল কষ্ট ই হবে।
চলে যখন যাবে আর এসবকিছুর কি প্রয়োজন! কি চাচ্ছে জাফরিন, আরো আবেগপ্রবণ হয়ে আহিন জাফরিনের বিরহ মেনে নিতে না পেরে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যাক!
আহিনের কড়া গলায় বলল,
"কি সমস্যা? চলে যাওয়ার আগে এসব ন্যাকামি কেন করছেন! কি বুঝাতে চাচ্ছেন?"
জাফরিন মুখ কালো হয়ে এল। আহিন সেটা দেখলনা, জাফরিনের পাশ কেটে বেরিয়ে গেল। জাফরিন ঘড়ির দিকে তাকাল বরাবর রাত ১০টা বাজে, আহিন এখনো ফিরেনি। অথচ ওর অফিস ৯টায় ছুটি হয়। জাফরিন নিজে নিজে কিছুক্ষণ হাসল তারপর প্রচন্ড কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।
সে ঠিকই ভেবেছে, আহিন তাকে চায়না! আহিনও খুব করে চাচ্ছে সে তার থেকে দূরে চলে যাক। এতদিন আহিনের সব সহ্য করে নেওয়া, তার প্রতি কেয়ারিংগুলো কে সে ভালোবাসা ভেবে ভুল করেছিল। তাই কালরাতে আহিনের স্ত্রীরুপে আজীবন থাকার কথা চিন্তা করেছিল।
ভেবেছিল, আহিন হয়ত তাকে বুকে টেনে নিয়ে বলবে, "কোথাও যাবেননা আপনি!" কিন্তু জাফরিনের সব ভাবনা ভুল। এই কয়েকদিনের কেয়ারিং, সহ্য করে নেওয়া এইগুলো আহিন বাধ্য হয়ে করেছিল।
প্রথমে তাই ই মনে হয়েছি জাফরিনের তাই সে চুপচাপ থেকে নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়েছিল এখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু কাল আহিনের কন্ঠস্বর তাকে ভাবিয়েছে, আহিন তাকে চায়।
#জাফরিন_পর্ব_০৯
#jafrin_part_09
#https://banglastory143.blogspot.com/
আজ সকালের আচরণ বুঝিয়ে দিয়েছে আহিন কখনোই জাফরিনকে চায়নি।
আহিন শহরের ফুল দোকান থেকে একগুচ্ছ রজনীগন্ধার ছড়া কিনল, বড় বড় নরম তুলতুলে রসগোল্লাভর্তি বড় সাইজের হাড়ি নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল।
সকালে রাগের মাথায় জাফরিনের সাথে খারাপ আচরণ করার পর থেকেই তার মনটা খচখচ করছে।
তার মন খুব করে বলছে, জাফরিনকে একবার অন্তত না চলে যাওয়ার অনুরোধ করতে। মনের কথাটা বলতে। তারপর যা হবার তা হবে।
এসব শুনেও যদি জাফরিন চলে যায় তাও আহিনের এইটুকুও আফসোস থাকবেনা। জাফরিনকে নিজের মনের কথাটা বলতে না পারলে সারাটাজীবন একটা কঠিন কষ্টে জ্বলে মরবে সে। তাই আজ যা ই হোক, সে বলবেই।
আহিন ঘড়ির দিকে তাকায় ; ১০টা বেজে ৫০মিনিট। মফস্বল শহরের ফুলের দোকানের রজনীগন্ধা পায়নি, তাই সদরে এসেছে। তাতেই এত দেরী হয়ে গেল। খুব ছটফট লাগছে তার, কখন বাড়ি পৌছাবে আর কখন জাফরিনকে মনের কথাটা জানাবে। জাফরিন কি উত্তর দিবে সেটা জানার জন্য সে উদগ্রীব হয়ে আছে।
আহিন রজনীগন্ধা আর রসগোল্লা নিয়ে রুমে ঢুকল, রুমে কোথাও জাফরিন নেই। ছাদে, বাড়ির পিছনের বাঁশঝাড়েও দেখে এল সেখানেও জাফরিনকে পেলনা।
আহিনের চেচামেচিতে বাড়ির সবাই জেগে গেল, কেউ ই বলতে পারলনা জাফরিন কোথায়! সবাই তাকে শেষবার রুমে ঢুকতে দেখেছিল।
আহিনের আর বুঝতে বাকি রইলনা। জাফরিন তাকে ছেড়ে সত্যিই চলে গেছে। আর কখনোই সে আহিনের কাছে ফিরবেনা। আহিনের অনুভূতিগুলোকে সে দাম দিলনা....
#জাফরিন_পর্ব_০৯
#jafrin_part_09
#https://banglastory143.blogspot.com/
🔰 🔰 🔰 চলবে 🔰 🔰 🔰
No comments