জাফরিন - পর্ব-০৮ | Jafrin - Part-08
গল্প | #জাফরিন 💫
পর্ব | ০৮
লেখক | আস্থা রাহমান শান্ত্বনা

আহিন ডাক্তারকে বিদায় দিয়ে জাফরিনের মাথার পাশে এসে বসে। বড় একটা শ্বাস ছেড়ে জাফরিনের দিকে তাকাল। জাফরিন এখনো ঘুমাচ্ছে।
#জাফরিন_পর্ব_০৭
#jafrin_part_07
#https://banglastory143.blogspot.com/
ডাক্তার সাময়িকভাবে কিছু ওষুধ দিয়ে বলে গেছে, "খুব বেশী প্রেশার ক্রিয়েট করা হয়েছে তার উপর। শরীরের কিছু অংশে খুব জোরে আঘাত করা হয়েছে তা সহ্য করতে না পেরে এমন অবস্থা হয়ে গেছে।"
জাফরিনের গলার কাছে লাল দগদগে দাগ স্পষ্ট, চাবুকজাতীয় কিছু দিয়ে আঘাতটা করা হয়েছে বুঝা যাচ্ছে। মেয়েটাকে এখন ভীষণ শান্ত দেখাচ্ছে, চঞ্চল টাইপের বাচ্চারা বকা খেয়ে নিশ্চুপ হয়ে গেলে দেখতে যেমন মায়া মায়া লাগে জাফরিনকে দেখে আহিনের তেমন লাগছে।
জাফরিনের বুক থেকে শাড়ির আচল সরে আছে, আহিন সুন্দরভাবে গুছিয়ে বুক ঢেকে দেয়। তারপর জাফরিনের মুখের একপাশে এলোমেলো হয়ে থাকা পড়ে থাকা চুলের গোছা সরিয়ে দেয়।
এমনসময় আয়শা খানম এসে আহিনকে জিজ্ঞেস করে, "মরল নাকি মেয়েটা!"
কথাটা শুনে আহিন রাগান্বিত চোখে মায়ের দিকে তাকায়। কেন জানি তার এসব কথা শুনে খারাপ লাগছে। হালকা মেজাজ দেখিয়ে বলল, "মা এসব কি কথা? দেখছো ই তো অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে। তোমার কি বিবেকবোধ নেই?"
"কিসের বিবেক দেখাব ওর জন্য? একটা ডাইনী, এসেছে তোর জীবনটা নষ্ট করতে। মরে আপদ বিদায় হলেই ভাল। তোর আবার ভাল দেখে একটা বিয়ে দিব।"
"মা তুমি এখান থেকে যাও। সহানুভূতি না দেখাতে পারো, কারো মৃত্যুকামনা করো না!"
#জাফরিন_পর্ব_০৭
#jafrin_part_07
#https://banglastory143.blogspot.com/
আয়শা খানম কিছু অপ্রস্তুতবোধ করে চলে গেলেন। আহিন আরেকবার জাফরিনের দিকে তাকাল। কেন জানি জাফরিনের মুখের দিকে তাকিয়ে তার ভীষণ মায়া লাগছে।
জাফরিনের উপর তার যতই রাগ থাকুক, সে কখনো তার এমন অবস্থা দেখতে চায়নি। তাই হয়ত অনেক বেশী'ই খারাপ লাগছে।
জ্ঞান ফেরার পর জাফরিন গম্ভীরমুখে বসে আছে। কোনো কথা ই বলছেনা, রোজকার মত পা দুলিয়ে আহিনকে কোনোরকম বিরক্ত ও করছেনা। একদৃষ্টিতে জানলার দিকে তাকিয়ে আনমনে কি যেন ভেবে চলেছে।
আহিন জাফরিনের সামনে বসে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে গলা ঝেড়ে নিয়ে বলল, "খুব বেশী ব্যথা আছে এখন?"
জাফরিন উত্তরে কিছু বললনা। একবার আহিনের দিকে তাকিয়ে আবার আগের মত আনমনে বাহিরের দিকে তাকিয়ে রইল। আহিন কিছুটা অবাক হল তারপর ভাবল হয়ত অসুস্থ তাই এমন চুপ হয়ে আছে। আহিন কয়েকবার খাবার খাওয়ার তাগাদা দিল কিন্তু জাফরিন প্রতিবার ই মাথা নাড়িয়ে জানাল সে খাবেনা।
"খাবার না খেলে ওষুধ খাবেন কি করে? রাতে কিন্তু ব্যথায় ঘুম হবেনা।" জাফরিন নীচুকন্ঠে বলল,
"আমার খেতে ইচ্ছে করছেনা।"
#জাফরিন_পর্ব_০৭
#jafrin_part_07
#https://banglastory143.blogspot.com/
"কি খেতে ইচ্ছে করছে বলুন! তাই এনে দিচ্ছি, ওষুধটা কিন্তু খেতেই হবে। নাহলে শরীর আরো বেশী খারাপ লাগবে।"
এইটুকু বলে আহিন চমকে উঠল। নিজের অজান্তেই সে বলে ফেলল বুঝতে পারলনা, মেয়েটা খাচ্ছেনা বলে তার এত খারাপ লাগছে কেন! কেন মন বলছে, জোর করে হলেও তাকে খাইয়ে দিতে। জাফরিন ছোট্ট নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
"আপাতত তেমন কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে।"
আহিন একটু হতাশ হল, হঠাৎ করে মেয়েটা এমন হয়ে গেল যে তার দেখেই কান্না পাচ্ছে। আশা করেছিল, প্রতিবারের মত আহিনের গলা জড়িয়ে না হলেও খুব উৎসাহ নিয়ে চোখ বড় বড় করে বলবে, "আমার অমুক জিনিস খেতে ইচ্ছে করছে। এনে খাওয়াবি?"
আহিন মন ভার করে উঠে যেতেই জাফরিন আহিনের টি-শার্টের অংশ টেনে বাচ্চাদের মত আধোস্বরে আবদার করে বলল, "আমার না হয় খুব মায়ের হাতের ক্ষীরের পায়েস খেতে ইচ্ছে করছে। এনে খাওয়াবি?"
আহিনের মুখে হাসি ফুটে উঠল। তার মনে হচ্ছে, জাফরিন যদি তাকে এমনভাবে চাঁদ এনে দিতে বলে সে চাঁদ এনে দেওয়ার বাজিও ধরে ফেলতে পারবে।
আয়শা খানম রান্নাঘরে কিসমিস, কাজু, ক্ষীরসহ নানা সরঞ্জাম দেখে আহিনের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে বলল,
"হঠাৎ এসব কিনে এনেছিস কেন?"
"মা জাফরিনের খুব ক্ষীরের পায়েস খেতে ইচ্ছে করছে।"
তো আমি কি করব?"
"ও মায়ের হাতের পায়েস খেতে চেয়েছে। ওর মা আদৌ কোথায় আছে জানিনা এখন তো তুমিই ওর মা। তোমার একটা অসুস্থ সন্তান যদি খেতে চায়, তুমি বানিয়ে খাওয়াবেনা?"
"ওকে আমি সন্তান তো দূরের কথা তোর বউ হিসেবেও মানিনা। আর যে আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল, তাকে আমি নিজ হাতে পায়েস বানিয়ে খাওয়াব সেটা ভাবলি কি করে!"
আহিন শত বলেও আয়শা খানমকে পায়েস বানাতে রাজি করাতে পারলনা। অগত্যা সে বাহিরে বেরিয়ে গেল। যে করে হোক, যেখান থেকেই হোক পায়েস এনে খাওয়াবে জাফরিনকে।
#জাফরিন_পর্ব_০৭
#jafrin_part_07
#https://banglastory143.blogspot.com/
রাতের দিকে আহিন বাসায় ফিরল ছোট্ট হাড়িভর্তি পায়েস নিয়ে, অনেক কষ্টে সদর থেকে পায়েস আনার ব্যবস্থা করেছে। রুমের দরজায় আসতেই ভিতরের দৃশ্য দেখে তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। সে কি স্বপ্ন দেখছে নাকি কল্পনা করছে বুঝার জন্য কয়েকবার চোখ ডলে নিয়ে আবার তাকাল। মা জাফরিনকে খুব যত্ন করে পায়েস খাওয়াচ্ছে।
জাফরিনের মুখের গম্ভীরভাবটা অনেকটা উবে গেছে। খাওয়ানোর ফাকে মা খুব যত্ন করে জাফরিনের লম্বা চুলে খোপা করে দিলেন, শাড়ি বদলে অহনার একটা থ্রী-পিচ পড়েছে জাফরিন। খুব মিষ্টি দেখাচ্ছে তাকে।
মায়ের কথায় আহিনের ভাবনার ধ্যান ভাঙ্গল।
"তুই হাড়িতে করে কি পায়েস এনেছিস?"
"হ্যা, তুমি তো বললে পায়েস বানিয়ে দিবেনা।"
"বলেছি বলে কি বানিয়ে দিতে পারবনা। হাড়িটা আমায় দে, এটার পায়েস খাওয়ানো লাগবেনা। আমি বানিয়ে খাইয়ে দিয়েছি।"
"হঠাৎ কি হল তোমার!" আয়শা খানম একটু চাপাস্বরে বললেন, "মেয়েটার অসুস্থ বাচ্চা বাচ্চা মুখটা দেখে মনটা গলে গেল, তার উপর আধোস্বরে বলে কি জানিস "মা আপনার হাতের পায়েস না খেতে পারার আপেক্ষ নিয়ে যদি মারা যাই, আপনার আফসোস হবেনা! এমনভাবে বললে কি কেউ আর ঠিক থাকতে পারে।"
আহিন মুচকি হেঁসে জাফরিনের দিকে তাকাল। মেয়েটার মধ্যে যে কারো মন গলানোর অসীম একটা ক্ষমতা আছে।
#জাফরিন_পর্ব_০৭
#jafrin_part_07
#https://banglastory143.blogspot.com/
জাফরিন ওপাশ ফিরে ঘুমাচ্ছে। আহিন বার বার ঘাড় ফিরিয়ে দেখছে জাফরিন একবার এইপাশ ফিরে কিনা! কিন্তু জাফরিন আজ একটুও নড়ছেনা, আর প্রতিদিন ঘুমালে তার হুশ থাকতনা। আহিন ঘুমের মধ্যেও জাফরিনের প্রচুর নড়াচড়ার কারণে যেমন-তেমনভাবে চড়-লাথি খেত। এইজন্য একদিন তো আহিন উঠে সোফাতে শুয়েছিল। জাফরিন তার টি-শার্টের কলার ধরে খাটে ফেলে বলেছিল, "তুই এখানেই ঘুমাবি, তোকে ছাড়া বিছানায় কিছু একটা নাই নাই লাগে!" আহিন সেদিন ভ্যাবলার মত মুখ করে ভেবেছিল, "সেটাই তো। আমি না থাকলে ঘুমের মধ্যে আপনার চড়-থাপড় কে খাবে!"
আর আজ অসুস্থ হয়ে মেয়েটা এতটাই চুপ হয়ে গেছে যে, আজ ঘুমের মধ্যে একটুও নড়াচড়া করছেনা। ব্যাপারগুলো কেন জানি আহিনের একটুও সহ্য হচ্ছেনা। মনে চাচ্ছে, জাফরিনকে শক্ত করে চেপে ধরে বলুক এত চুপ হলেন কেন! আপনাকে এভাবে দেখে আমার সহ্য হচ্ছেনা! একটুও সহ্য হচ্ছেনা!
এমনসময় জাফরিন ঘুমের মধ্যে ই ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে। আহিন আচমকিত হয়ে তার দিকে তাকায় , পরক্ষণেই কিছু না ভেবেই জাফরিনকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
"ভয় পেয়েছেন? কিচ্ছু হবেনা। আমি আছি তো এখানে!"
জাফরিন তখনো ঘুমের ঘোরে হালকা ফুপিয়ে ফুপয়ে কাঁদছে। আহিন খুব অস্থির হয়ে বার বার জাফরিনের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। খানিকবাদে জাফরিন কান্না থামিয়ে আহিনের টি-শার্ট খামচে ধরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
আহিন তবুও বুক থেকে সরায়না জাফরিনকে, আরো শক্ত করে বুকের কাছে চেপে ধরে জাফরিনের চুলে নাক ডুবিয়ে চুলে বিলি কেটে দিতে থাকে।
জাফরিন আগের থেকে মোটামুটি অনেকটা সুস্থ। শরীরের দাগগুলো ও হুট করে মিলিয়ে গেছে। সবই ঠিক হয়ে গেছে, কিন্তু আগের মত চঞ্চলতা ভাব যেন নেই। আহিনকে একরকম এড়িয়ে চলে, আগের মত জ্বালায়না। খুব কম ই কথা বলে, অতি দরকারী না হলে কথা বলেনা এবংকি উত্তর দেয়না। এগুলো আহিনের মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে।
কেন জানি তার মন চাচ্ছে, জাফরিন তাকে খুব বিরক্ত করুক এবং আগের মত জ্বালাক। এসব নিয়ে আহিন খুব অশান্তিতে ভুগছে। বাসার সবার সাথেই জাফরিন স্বাভাবিকভাবে কথা বলে, কিন্তু আহিনকে দেখামাত্রই চুপ হয়ে যায়। তখন বোম মারলেও তার মুখ দিয়ে কথা বের হয়না।
আহিনের কাছে খুব খারাপ লাগলেও সে জাফরিনকে মুখ ফুটে কিছু বলেনা। আহিন বই পড়তে পড়তে আড়চোখে কয়েকবার জাফরিনের দিকে তাকায়।
জাফরিন জানলার পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কি যেন ভাবছে। আজ তাকে বেশ পবিত্র দেখাচ্ছে, চুলগুলো বেশ যত্ন করে বাধা। কিছুদিন ধরেই সে আর চুল এলোমেলো করে রাখেনা, শাড়িটাও বেশ গুছিয়ে পড়ে। বুক থেকে শাড়ির আচল সরে যায়না, আচল মাটিতে গড়াগড়ি খায়না।
কিন্তু এতে আহিনের মন ভরেনা, মনে হয় যেন আগের জাফরিনটা ই বেশ ভাল ছিল।
#জাফরিন_পর্ব_০৭
#jafrin_part_07
#https://banglastory143.blogspot.com/
"আমি যদি তোকে মুক্তি দিয়ে চলে যাই?"
জাফরিনের হঠাৎ বলা এই কথায় আহিন চমকে উঠে। জাফরিনের মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে কথাটা কি সে মজা করে বলছে! কিন্তু জাফরিন বেশ স্বাভাবিকভাবেই কথা বলল।
"ঠিক বুঝলামনা!"
"আমি যদি এখান থেকে চলে যাই তোকে মুক্তি দিয়ে, আর কখনো ফিরে না আসি......
🔰 🔰 🔰 চলবে 🔰 🔰 🔰
No comments