জাফরিন - পর্ব-০৭ | Jafrin - Part-07

গল্প | #জাফরিন 💫

পর্ব | ০৭

লেখক | আস্থা রাহমান শান্ত্বনা 


জাফরিন চোখ বড় বড় করে রিফাতের দিকে তাকিয়ে আছে। রিফাত উলটো হয়ে শূণ্যে ঝুলছে, তার হাত দুটো পিছনে বাধা। প্রানপণে চিৎকার করছে, কিন্তু আওয়াজটা শুধু ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। 


জাফরিন রিফাতের প্যান্টের মাঝামাঝিতে কষে একটা লাথি মারল। বেচারা ব্যথায় "আফাগো" চিৎকার করে উঠল। জাফরিন তার চুল চেপে ধরে বলল, 

#জাফরিন_পর্ব_০৭
#jafrin_part_07
#https://banglastory143.blogspot.com/



"তুই তোর বন্ধুর কানে কি মন্ত্রণা দিয়েছিস! একবারে তোর শিক্ষা হয়নি তাইনা?" 


"আফা, আমি কোনো মন্ত্রণা দিইনি। ও তো উলটা আমাকে বলছে আপনাকে বাড়ী থেকে বের করার বুদ্ধি দিতে।" 


"আর তুই এমন একটা বুদ্ধি দিলি! আমাকে কি ঘাসে মুখ রাখা ছাগল মনে হয় তোর? লুচুর ঘরের লুচু, আবার এমন একটা লাথি দিব ঝুনঝুনিগুলো ও হারাবি। আর কোনোদিন যদি বুদ্ধুটার আশে-পাশে তোকে দেখিনা....." 


"না আফা আর কোনোদিন দেখবেন না। এবার আমাকে নিচে নামিয়ে দেন।" 


জাফরিন চলে যাওয়ার পর রিফাতের চোখে ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠে, জেদে ডান হাতটা মুষ্ঠিবদ্ধ করে নেয়। 


মোতালেব খা রাগান্বিত কন্ঠে বলল,

"সকাল থেকে বাড়ীর বউ বাড়ীতে নেই, আর সেটা কেউ ভ্রুক্ষেপ ই করছোনা। সারাদিন আমাকে কেউ জানানোর ও প্রয়োজন মনে করলেনা।" 


আহিন আর আয়শা খানম একবার চোখাচোখি করে নেয়। আহিনের এসব বিরক্ত লাগছে, জাফরিন চলে গেছে কোথায় খুশিতে একটু আয়েশ করবে তা না এখানে দাদার বকা গিলতে হচ্ছে। 


"আচ্ছা দাদা যদি জাফরিনকে খুজে আবার এই বাড়ীতে ফিরিয়ে নিয়ে আসে?" এইটুকু ভেবে আহিনের মুখ শুকিয়ে যায়। জাফরিন যদি ফিরে আসে, তাহলে আহিনের আর রক্ষে নেই। কথা শুনিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য মেয়েটা তাকে চিবিয়েই খেয়ে নিবে। 


আয়শা খানম কাচুমাচু হয়ে বললেন,

#জাফরিন_পর্ব_০৭
#jafrin_part_07
#https://banglastory143.blogspot.com/


"কি আক্কেল মেয়েটার দেখুন! ওর কাছে অহনাকে রেখে হাসপাতালে গিয়েছে সবাই, এই সুযোগে কোথায় কেটে পড়ল। সন্ধ্যা নেমে রাত হয়ে গেছে তাও ফেরার নাম নেই।" 


আহিনের কাকি ফাতেমা বেশ জোরালো কন্ঠেই বলল,

"দেখেন, কোন নাগরের হাত ধরে পালিয়ে গেছে! এই মেয়ের মতিগতি আমার একদম ঠিক লাগেনা। সেদিন রাতে পানি খাওয়ার জন্য উঠে দেখি ছাদের দরজা খোলা, ছাদের দরজায় গিয়ে দেখি এই মেয়ে এক মাথা থেকে অন্য মাথা ঘুরছে। ফিসফিস করে একা একা কথা বলছে।" 


আহিন একটা মস্ত ঢোক গিলে ভাবতে লাগল জাফরিনের আসল সত্যটা এখন বলবে কিনা! যেহেতু মা আয়শা খানম আর তার কাকী অনেকটা আচ করে ফেলেছে, বললে অবিশ্বাস করবেনা। 


আহিন কিছু বলার আগেই মোতালেব খা ধমকি দিলেন, এসব বেহায়াপনা কথাবার্তা বলা বন্ধ করো। মেয়েটাকে না খুজে তোমরা আজে-বাজে বকে আমার কান ভারি করছো। 


আহিন তোর বাপ-কাকাকে নিয়ে এক্ষুনি ওকে খুজতে বের হ। আমার নাতবউকে সকাল হওয়ার আগে আমি এই বাড়ীতে দেখতে চাই। না হলে এই বাড়ীতে কারো জায়গা হবেনা। 


আহিন কিছুটা চুপসে গেলেও জোর নিয়ে বলল,

"দাদা, অযথা জাফরিনকে নিয়ে বেশী উত্তেজিত হচ্ছেন। আমরা ওকে যেটা ভাবি ও সেটা নয়, ও আমাদের কল্পনাতীত একটা সৃষ্টি।" 


আহিনের দাদা ভ্রু কুচকে বলল, "হেয়ালি না করে যা বলার স্পষ্ট করে বলো। ইদানিং তুমি বেশীই পেচিয়ে কথা বলছো আহিন। আমার সাথে হেয়ালি করোনা।"

আহিন কিছু বলার আগেই জাফরিন ছুটে এসে দাদার পায়ে পড়ে সালাম দেয়। তারপর পা ধরে বসে কান্নার আওয়াজ তুলে।  সবাই হতভম্ব হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। 


"একি কাদছিস কেন? এতক্ষণ কোথায় ছিলি তুই?"

জাফরিন মোতালেব খা'র হাত জড়িয়ে ধরে কাদতে কাদতে বলে, "কত আশা নিয়ে বিয়ে করে এই বাড়ীতে এসেছি, ভেবেছি সবাইকে নিজের করে নিয়ে সুখে সংসার করব। এই আশা আমার পূরণ হল না দাদা।" 

#জাফরিন_পর্ব_০৭
#jafrin_part_07
#https://banglastory143.blogspot.com/


"কেন কি হয়েছে? "

"আমার স্বামী আমার সাথে ঘর করতে চায়না। কথায় কথায় ঝাড়ি দেয়, অকারণেই মারে। কাল আমাকে উনি বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। দোষ একটাই, আমি নাকি উনার মনমত না! উনাকে আপনারা জোর করে বিয়ে দিয়েছেন।" 


মোতালেব খা ভয়ংকর রেগে গেলেন। আহিনের দিকে তাকাতেই আহিন আমতা আমতা করে বলল,

"এই মেয়ে সব সত্যি বলছেনা দাদা। আপনি আমার সব কথা শুনলে বুঝতে পারবেন। জাফরিন, আপনি বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা কেন বলছেন? এসব নাটক বন্ধ করুন। আজ আমি আপনার আসল সত্যটা সবাইকে বলেই ছাড়ব।" 


মোতালেব খা হুংকার ছাড়লেন,

"তুমি ওকে কাল বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছো?"

"হ্যা, কিন্তু দাদা ও....." 


"এরজন্য তোমাকে এই মূহুর্তে আমি ত্যাজ্য করে দিতে পারি। কিংবা কোনো কঠোর শাস্তি দিতে পারি।" 


"দাদা, আপনি আগে আমার কাছ থেকে শুনুন ও কে!" 


"আজ থেকে জাফরিনের সব কথা তুমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে, ও যা চায় তাই ই করবে। কোনো রকম ঝাড়ি বা গায়ে হাত তুলবেনা। এটাই তোমার শাস্তি। এটা যদি তুমি না মানো তবে তোমাকে আমি ত্যাজ্য করে এই বাড়ী থেকে বের করে দিব।" 


আহিন চুপ হয়ে গেল। জাফরিনের মাথায় হাত বুলিয়ে মোতালেব খা বললেন, "ও যদি আমার কথা অমান্য করে সাথে সাথে আমাকে জানাবে। বাকিটা আমি বুঝব।" 


জাফরিন "আচ্ছা" বলে হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে আহিনের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ দেয়। 

#জাফরিন_পর্ব_০৭
#jafrin_part_07
#https://banglastory143.blogspot.com/


"এই বুদ্ধু! বুদ্ধু, উঠ না। এই শালা, ঘুম থেকে উঠ!" বলে আহিনকে এক ধাক্কা দিয়ে বিছানা থেকে ফেলে দেয় জাফরিন। আহিন ঘুমচোখে বিরক্তি নিয়ে বলল, 


"এটা কি ধরণের অসভ্যতা! আপনার জন্য কি এখন ঘুমাতে পারবনা?" 


জাফরিন ঠোট কামড় দিয়ে ধরে রেখে বলল, "খুব শখ হয়েছে আমাকে তাড়ানোর। কিন্তু আমি তো আগেই বলেছি আমাকে তুই তোর ঘাড় থেকে কখনো নামাতে পারবিনা।"

"কি চান কি আপনি? এভাবে কেন আমার পিছনে পড়ে আছেন?" 


"আমাকে কোলে নে।"

"কি?"

"এখন চাইছি তুই আমাকে কোলে নিয়ে ছাদে নিয়ে চল।"

"মশকরা হচ্ছে আমার সাথে?"

"চড়্গুলোর স্বাদ এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলি? 


উহু আজ তোকে চড় খাওয়াবনা, বকরীর কাচা নাড়িভুড়ি খাওয়াব। একদম জোর করে গিলিয়ে দিব।" 


বকরীর কাঁচা রক্তাক্ত নাড়িভুড়ির দৃশ্য এবং জাফরিনের চিঁবিয়ে খাওয়ার শব্দ মনে পড়তে আহিনের গা শিরশির করে বমি আসতে চাইল। 


অগত্যা আহিন বাধ্য হয়ে জাফরিনকে কোলে নিয়ে ছাদে আসল। 


ছাদে উঠে জাফরিনকে নামিয়ে জিহবা বের করে হাপাতে লাগল। মেয়েটা যখন কোলে নিয়েছিল তখন তআর মনে হয়েছিল তুলতুলে একটা পুতুল কোলে নিয়েছে। তারপর যতটা পা বাড়িয়েছে তার দ্বিগুণ করে ওজন ভারী হয়েছে। 


আহিনকে হাপাতে দেখে জাফরিন হেসে উঠে বলল,

"তোর ওজন আমার থেকেও বেশী। তোর মত ধানের বস্তাকে আমি দুইবার কোলে নিয়েছি, আর তুই একবারে কাত!" 


আহিন প্রতিউত্তর না করে বিড়বিড় করে জাফরানকে কিসব বলতে লাগল।

#জাফরিন_পর্ব_০৭
#jafrin_part_07
#https://banglastory143.blogspot.com/


"তুই এখানে বস, আমি কিছুক্ষণ এখানে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকব। যখন আমার ঘুম এসে যাবে আমাকে কোলে তুলে ঘরে নিয়ে যাবি। নাহলে কিন্তু বকরীর পায়া খাওয়াব।" 


জাফরিন ছাদের মাঝখানে দুইদিকে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। চাদের পূর্ণ জ্যোৎস্না এসে ওর গায়ে পড়ছে, ওর শরীর তাতে ঝলমল করছে। শরীর থেকে একপ্রকার চোখ ধাধানো আলো বের হচ্ছে। আহিন সেদিকে তাকিয়ে থাকতে পারছেনা, তবে তার মনে হচ্ছে চারিদিকে একসাথে অনেক সাপের হিসহিস আওয়াজ। ছাদটা যেন সাপে ভরে গেছে, এতটাই জোরে আওয়াজ হচ্ছেনা। 


সেই সাথে জাফরিনের শরীর থেকে এক মোহনীয় তীব্র ঘ্রাণ বের হকচ্ছে, ঘ্রাণের তীব্রতায় আহিনের মাথা ঝিমঝিম করে উঠছে। সে এখানে আর একমূহুর্ত থাকতে পারছেনা, দম কেমন যেন আটকে আসছে। দেরী না করে আহিন নীচে নেমে এসে ভিতর থেকে ছাদের দরজা তালা আটকে দিয়ে ঘরে চলে এল। 


আহিন অফিসে এসে কম্পিউটারে হিসাবগুলো মিলিয়ে নিচ্ছে। হঠাৎ ফোনে আয়শা খানমের কল এল।

"হ্যা মা বলো।"

"তুই সকাল সকাল কিছু না খেয়ে বেরিয়ে এলি কেন?"

"একটা জরুরী কাজ ছিল। আমি এখানে খেয়ে নিয়েছি। কিছু বলবে?"

"তোর দাদা জাফরিনের খোজ করছিল, কোথায় সে?" 


আহিন বিরক্তকন্ঠে বলল,

আর কোথায় থাকবে? কোনো রুমে হয়ত পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে। তুমি কি ওর কথা বলার জন্য কল দিয়েছো? 


আরে না। সে মেয়ে ঘুমাক বা জাহান্নামে যাক আমার মাথাব্যথা নেই। তোর দাদা বের হওয়ার আগে জিজ্ঞেস করেছিল তাই বললাম। সকাল থেকে তো দেখিনি ওকে। 


যে কথাটা বলতে ফোন দিয়েছি, আসার সময় বাবুর দোকান থেকে ছাদের চাবিটা বানিয়ে নিয়ে আসিস তো। সকাল থেকে চাবি খুজছি চালের গুড়া রোদে দিব, পাচ্ছিনা। মনে হয় হারিয়ে ফেলেছি। বাবুর কাছে চাবির মাপ আছে, আসতে নিয়ে আসি।" 


"আচ্ছা নিয়ে আসব, এখন রাখছি।" 

#জাফরিন_পর্ব_০৭
#jafrin_part_07
#https://banglastory143.blogspot.com/


ফোন রেখে কাজে মন দিতেই কি একটা ভেবে আহিন অস্থির হয়ে উঠল। বস থেকে ছুটি নিয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় এসে বিছানার তলা থেকে চাবি বের করে পাগলের মত ছাদের দিকে ছুটে যায়। তালা খুলে ছাদে ঢুকে দেখে জাফরিন উলটে পড়ে শুয়ে আছে, তার মুখ দিয়ে সাদা ফেনা বের হচ্ছে। 


আহিন কাছে গিয়ে জাফরিনকে ধরে উঠায়। ওর শরীর একদম আগুনে ঝলসে যাওয়ার মত গরম।


আহিনের কলিজা মোচড় দিয়ে উঠে মেয়েটা মরে গেল নাকি!


🔰 🔰 🔰 চলবে 🔰 🔰 🔰

No comments

Powered by Blogger.