জাফরিন -পর্ব-০৩ | Jafrin - Part-03

🔰 জাফরিন পর্ব-০৩ 🔰
আস্থা রাহমান শান্ত্বনা

আহিন অফিস থেকে ফিরে গলার টাই আলগা করতে করতে রুমে ঢুকে। বেশ ক্লান্তি অনুভব করছে, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। এক গ্লাস লাচ্ছিতে গলা ভেজানোর ইচ্ছে হল।


বিড়বিড করতে করতে বিছানায় গা এলিয়ে চোখ বুজে রাখে। জাফরিনের গলার খ্যাকারি আওয়াজ শুনে চোখ মেলে উঠে বসে। মেয়েটার কন্ঠ তার সামনে এলেই যেন খ্যাকারি আর কর্কশ রুপ ধারণ করে, যা শুনলে আহিনের বুক ধড়ফড় করে উঠে। উঠে বসে রুমের এদিক সেদিক চোখ বুলালো জাফরিনকে দেখতে পেলনা।

#জাফরিন_পর্ব-০৩
#jafrin_part-03
#banglastory143

"ওই বুদ্ধু এদিক ওদিক কি দেখছিস, আমি উপরে!"


আহিন কন্ঠ শুনে মাথা তুলে আলমিরার উপরে তাকায়। জাফরিন সেখানে বসে দিব্যি পা দোলাতে দোলাতে আঙ্গুল চাটতে ব্যস্ত। আটপৌরে করা পড়া শাড়ির আচলটা নিচ অবধি ঝুলে আছে।


"আপনি সারাক্ষণ উপরে কি করেন? সামান্য কান্ডজ্ঞান নেই। কেউ যদি রুমে ঢুকে এই অবস্থায় দেখে নেয়!"


কথাটা শুনে জাফরিন চোখ বড় বড় করে আহিনের দিকে তাকায়। সেই দৃষ্টিতে আহিনের গলা মিহিয়ে আসে।


"তোর থেকে আমার কান্ডজ্ঞান অনেক বেশী। অযথা আমার কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করিসনা। বা'পাশে তাকিয়ে দেখ তোর জন্য একগ্লাস লাচ্ছি রাখা আছে।"


আহিন ঘাড় ঘুরিয়ে বা পাশে তাকায়, লাচ্ছিভর্তি গ্লাসটা শুন্যে ভাসছে। অনেকটা অস্বস্তি নিয়ে গ্লাসটা হাতে নেয় সে।


ভাবতে থাকে, তার লাচ্ছি খেতে ইচ্ছে করছে সেটা জাফরিন কি করে জানল!


" তোর মনে কখন কি চলে সেটা আমি আন্দাজ করতে পারি!" বলেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে জাফরিন।


" এতে কিছু মিশানো নেই তো!" বলতে বলতে আহিন গ্লাসটায় চুমুক দেয়।


" আছে তো। মানুষের মলমূত্র।"

#জাফরিন_পর্ব-০৩
#jafrin_part-03
#banglastory143


শোনা মাত্র ই আহিন হাত থেকে গ্লাস টা ফেলে ওয়াক ওয়াক করতে বাথরুমের দিকে ছুটে যায়। মেয়েটা তাকে আচ্ছা নাচাচ্ছে! খানিকবাদেই ফ্রেশ হয়ে গম্ভীরমুখে রুমে ফিরে আসে।


জাফরিন এক লাফে নিচে নেমে আসে। তারপর দুহাত দিয়ে শক্ত করে আহিনের গলা জড়িয়ে বলে,


" একটা আবদার ছিল তোর কাছে।"


এভাবে জড়িয়ে ধরায় আহিনের যেন নিঃশ্বাস আটকে আসছিল। মনে হচ্ছে জাফরিনের বিশাল দুটো হাত তার গলার দুপাশে সমানে জোরে চেপে রেখেছে।


প্রায় হাপাতে হাপাতে বলল, "আগে গলা ছাড়ুন।"


জাফরিন আহিনের কথায় কর্ণপাত না করে বলতে লাগল,


" আমার খুব আস্ত বকরীর মাংস খেতে ইচ্ছে করছে। এনে রেধে খাওয়াবি? রোজ রোজ শাক-লতা খেয়ে জিভের ছাল উঠে গেছে।" আহিন দম ফেলতে ফেলতে বলে,


" খাওয়াব আগে গলা ছাড়ুন।"


" আমার বুদ্ধু জামাই!" বলে জোরে আহিনের গাল টেনে দিল। আহিন বিরক্তদৃষ্টিতে জাফরিনের দিকে তাকাল। গালের পাশটায় ব্যথা হচ্ছে, এমনভাবে টেনেছে যেন গালের মাংস বের করতে চাচ্ছিল।

#জাফরিন_পর্ব-০৩
#jafrin_part-03
#banglastory143


যত ই যা হোক, জাফরিনকে তার সহ্য করতে হচ্ছে। কোনো প্রশ্ন করলে কিংবা বিরক্তি দেখালেই তেড়ে এসে আচড় কাটে নতুবা কানের নিচে ঠাটিয়ে চড় লাগিয়ে দেয়। সেদিন চড় খেয়ে ২ঘন্টা পর্যন্ত আহিনের কানে কেবল শো শো আওয়াজ করছিল। সবকিছু দাতে দাত চেপে সহ্য করে আছে শুধু পরিবারের কথা ভেবে।


আহিন শুয়ে শুয়ে চিন্তা করে, "এসব অত্যাচার সে আর সহ্য করবেনা। অনেক হয়েছে। এবার নিজের প্রাণ নিয়ে এই মেয়ের থেকে পালাতে হবে। সে না থাকলে জাফরিন কাকে ভয় দেখাবে! তাই আর কারো ক্ষতি করার প্রশ্ন উঠে না। সুযোগ পেলেই সে পালাবে এই বাড়ী থেকে।"


পরেরদিন জাফরিনের ভয়ে আহিন বাজার থেকে আস্ত একটা মোটাসোটা বকরী কিনে বাড়ি ফিরে। বকরীটাকে উঠোনের এককোণায় বেধে ঘরে ঢুকতেই দেখে জাফরিন অহনাকে খুব জোরে একটা চড় মারল। এই দৃশ্য দেখে আহিনসহ তার মা ও কাকী থ হয়ে যায়। আয়শা খানম ছুটে এসে জাফরিনের গালে দুটো চড় লাগিয়ে দেয়।


তারপর পুরো ঘর নিস্তব্ধ। আহিনের শরীর কাপতে থাকে, মা এটা কি করল! এখন যদি জাফরিন রেগে গিয়ে উলটাপালটা কিছু করে বসে! এই মেয়ের কোনো ভরসা নেই। আহিন প্রায় ছুটে গিয়ে মায়ের গা ঘেষে দাঁড়ায়। আয়শা খানম অহনাকে বুকে টেনে নিয়ে চেচাতে থাকে।


" দুইদিন হয়নি এই বাড়ীতে এসেছো। এত সাহস হয় কি করে তোমার, আমার মেয়ের গায়ে হাত তুলো!"


জাফরিন মেঝের দিকে তাকিয়ে চুপ করে আছে, পায়ের নখ দিয়ে মেঝে খুটছে আপনমনে। আয়শা খানম জাফরিনের এমন লাপাত্তা ভাব দেখে এক ধাক্কা দিয়ে বলে।


" আমার মেয়ে কি করেছে! কেন মারলে তুমি ওকে?"

#জাফরিন_পর্ব-০৩
#jafrin_part-03
#banglastory143


আহিন হকচকিয়ে জাফরিনের দিকে তাকায়। জাফরিন একদৃষ্টিতে অহনার দিকে তাকিয়ে আছে। তার মুখে কোনো রা নেই। জাফরিনের এই চুপ থাকা আয়শার মাথা গরম করে দেয়। উনি এগিয়ে এসে আরো একটা চড় মারে জাফরিনের গালে। আহিন এই ঘটনায় হতবাক হয়ে যায়, মূহুর্তেই মাকে আটকানোর চেষ্টা করে। আহিনের কোনো বাধা না মেনে আয়শা খানম বলতে থাকে।


" এই মেয়েকে আমার আগে থেকে ভালো লাগেনি। জাত-পরিচয়হীন একটা মেয়ের সাথে তোকে বেধে দিয়েছেন বাবা। তাও মেনে নিলাম, কিন্তু এই মেয়ে তো রীতিমত বাড়িতে কর্তৃত্ব ফলাতে শুরু করেছে। এসব আমি সহ্য করবনা। সারাদিন পাটরাণীর মত সারাবাড়ি চষে বেড়াবে তারপর অকারণে আমার মেয়েটাকে মারবে।"


এমন চেচামেচি শুনে বাহিরে থেকে ছুটে আসে আহিনের দাদা মোতালেব খা। এসে হুংকার ছাড়ে।


" কি হয়েছে কি! কার এত অধঃপতন হয়েছে যে এতজোরে চিৎকার করে বাড়ীটাকে নিলামঘর বানাচ্ছে।"


আয়শা খানম চুপ মেরে যায়। শ্বশুড়কে তিনি প্রচন্ড ভয় পায়, কেবল তিনি নয় বাড়ীর সবাই ই তাকে অনেক ভয় পায় আর মেনে চলে। তার সামনে মুখ তুলে কথা বলার সাহস কারো নেই। তাও আয়শা কন্ঠ মিহি করে বলল।


" আপনার নাতবউ অকারণে অহনার গায়ে হাত তুলেছে। বারবার জিজ্ঞেস করার পর ও কারণ বলছেনা।"

#জাফরিন_পর্ব-০৩
#jafrin_part-03
#banglastory143


" ভাবী হিসেবে ননদীকে শাসন করার যথেষ্ট অধিকার ওর আছে। তার জন্য কি তোমাকে জবাবদিহি করতে হবে আয়শা? যাকে শাসন করেছে তাকে জিজ্ঞেস করলেই হয় সে অপরাধ করেছে। আমি যেন আর কোনোরকম চিৎকার না শুনি।" বলে লুঙ্গিতে শক্ত গিট্টু বাধতে বাধতে নিজের ঘরের দিকে হাটা দেয় মোতালেব খা।


আয়শা খানম রাগে বিড়বিড় করতে করতে অহনাকে নিয়ে চলে যায়। আহিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে জাফরিনের দিকে তাকায় একবার। জাফরিন একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে।


" আপনার জন্য বকরী কিনে এনেছি।"


জাফরিন আনন্দে একবার হাসে মূহুর্তেই আবার হাসিটা মিলিয়ে মুখটা অন্ধকারে ঢেকে যায়। কোনোকিছু না বলেই জাফরিন  রুমের দিকে একপ্রকার দৌড়ে চলে যায়।


"বকরীটা গেল কোথায় মা?"


আয়শা খানম আচলে হাত মুছতে মুছতে বাসার বাহিরে জিজ্ঞেস করে, "কার বকরী?"


আহিন নীচুকন্ঠে বলল, "আমি কিনে এনেছিলাম। জাফরিন বকরীর গোশত খেতে চেয়েছে।"


আয়শা খানম মুখ বাকিয়ে উপহাসের হাসি হেসে বলল।


" বিয়ের ক'দিন ও হলনা এরমধ্যে বউয়ের আচলের তলায় ঢুকে পড়লি। আমি কোনো বকরী দেখিনি, টাকা খরচ করে বউয়ের জন্য কিনেছিস তুই আর তোর বউ জানে।


আমি একটা কথা সাফ সাফ জানিয়ে দিচ্ছি, বাড়ীতে যেন বকরীর গোশত না ঢুকে। এই বাড়ীতে কেউ বকরী খায়না, তোর বউয়ের জন্য সারাবাড়ীতে বকরীর গন্ধ সহ্য করতে পারবনা।"


বলেই আয়শা খানম ভেতরে চলে গেলেন। আহিন এদিক সেদিক বকরী খুজে কোথাও পেলনা, এমনসময় দেখল জাফরিন শুকনোমুখে বাড়ীর পিছনে বসে আছে। কি এক গভীরচিন্তায় সে মগ্ন। চোখের দৃষ্টি একদম স্থির হয়ে আছে।


আহিন বকরী জবাই করে মাংস বাছতে বসল, এরমধ্যে আড়চোখে জাফরিনের দিকে তাকাল। জাফরিন বাশঝাড়ের উপর বসে লোভাতুর চোখে মাংসের দিকে তাকিয়ে আছে।


ইটের চুলার আগুনের শিখায় ওর মুখটা বেশ ভয়ংকর লাগছে, তার উপর চুলগুলো এলোমেলো ছেড়ে দিয়ে বাশঝাড়ের মাথায় বসে আছে মেয়েটা। যে কেউ দেখলেই ভুত বলে চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যাবে।


সকালে আনা বকরীটা কোথাও খুজে পায়নি আহিন, বাধ্য হয়ে বিকালে আরেকটা বকরী কিনে এনেছে। আয়শা খানমকে বার বার বলার পর ও উনি বকরীর গোশত ঢুকতে দিবেননা এই সিদ্ধান্তেই অটল রইলেন।

#জাফরিন_পর্ব-০৩
#jafrin_part-03
#banglastory143


তাই আহিন প্রয়োজনীয় জিনিসপাতি নিয়ে বাড়ির পিছনে বাশবাগানে বকরীর মাংস রান্নার আয়োজন করল। আজ জাফরিন তাকে কোনোপ্রকার জোর করেনি, তবুও আহিন এসব করছে। আসলে তার মা বকাঝকা করার পর থেকে জাফরিন চুপ হয়ে গেছে, সেটা দেখে তার কেন যেন খারাপ লাগছিল।


" এই শোন, পায়ার হাড়টা টুকরো করিসনা। ওটা আমি এখন খাব।"


কথাটা শুনে আহিন বিস্মিতকন্ঠে বলল।


" কাচা খাবেন?" জাফরিন অট্টহাসি দিয়ে হাতটা লম্বা করে আহিনের হাত থেকে হাড়টা কেড়ে নিল। এরপর বাশঝাড়ের মাথায় বসে কচকচ করে হাড়টা চিবিয়ে খেতে লাগল। এমনভাবে চেটে চেটে খাচ্ছে যেন, অনেকদিন পর সে তার প্রিয় খাবার খেতে বসেছে। দৃশ্যটা দেখে আহিনের শরীর ঘিনঘিন করতে লাগল, বমিও করে দিল। তার মাথাটা থেকে থেকে ঝিমঝিম করতে লাগল।


জাফরিন একটু চুপ থেকে বলল।


" নাড়িভুড়ি গুলো একটু ওদিকের শিমুল গাছতলায় রেখে আসবি? আমি ওখানে বসে খাব। তোর আমার খাওয়া দেখে বমি পাচ্ছে।"


কথাটা শুনে আহিনের পেটের নাড়িভুড়ি মোচড় দিয়ে উঠল। কোনোরকমে নাড়িভুড়ি রেখে এসে রান্নায় মনোযোগ দিল। ওদিক থেকে জোরে জোরে চিবিয়ে খাওয়ার শব্দ আসছে, শুনেই আহিনের গা ঘিন ঘিন করে উঠছে। তার মনে হল।


শুধু শুধু সে হাত পুড়িয়ে রান্না করছে, এই বকরীটা জাফরিন আস্তটাই কাচা খেতে পারত।


রান্না শেষ হওয়া মাত্রই জাফরিন তার সামনে এসে দাড়াল, তার মুখে এখনো কাচা মাংসের গন্ধ এবং তাজা রক্তের ছাপ লেগে আছে। আহিনের মনে হচ্ছে সে এক্ষুনি আবার বমি করবে তাও নিজেকে সামলে নিয়ে ডেকচিভর্তি মাংস জাফরিনের সামনে রাখে। জাফরিন গরম ধোয়া উঠা ডেকচির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে আস্ত হাড় টা বের করে চাটে কিছুক্ষণ। তারপর আহিনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে।


" খাবি?"


আহিন আর নিজেকে সামলাতে পারেনা হড়হড় করে বমি করে দেয় এবং জ্ঞান হারায়।

#জাফরিন_পর্ব-০৩
#jafrin_part-03
#banglastory143


🔰🔰🔰🔰

🔰🔰🔰

🔰🔰

🔰

(চলবে)

No comments

Powered by Blogger.